সোভিয়েতের তৈরি অদ্ভুত কিছু যুদ্ধযান, যা বিদায় নিয়েছে পৃথিবী থেকে

/১১

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পারমাণবিক বোমাতেই বাজিমাত করে আমেরিকা। গবেষকদের হাত ঘুরে সেই ঘাতক মারণাস্ত্রের ফর্মুলা পৌঁছেছিল সোভিয়েতের হাতে। আর তারপরই বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় এই দুই সামরিক শক্তির মধ্যে শুরু হয় রক্তপাতহীন এক দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ— ঠাণ্ডা যুদ্ধ। দুই দেশই ক্রমশ বাড়াতে থাকে তাদের সামরিক শক্তি। সামরিক গবেষণার ক্ষেত্রেও এই সময়ে এক নতুন যুগ শুরু হয়েছিল। প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করতে অদ্ভুত সব যন্ত্রের জন্ম দিয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। আজকের দিনে দাঁড়িয়েও যাদের অস্তিত্ব কল্পনায় আনা বেশ কঠিন আমাদের কাছে। দেখে নেওয়া যাক এমনই কিছু অদ্ভুতদর্শন যুদ্ধাস্ত্র এবং যুদ্ধযানদের।

/১১

২বি১ অকা— যত বড়ো যুদ্ধাস্ত্র, তার তত বেশি ক্ষমতা। স্পষ্টত এমনটাই মনে করছেন সে-সময়ের সোভিয়েতের শাসকরা। আর সেই চিন্তাভাবনা মাথায় রেখেই তৈরি হয়েছিল ২বি১ অকা। এই বিশেষ সামরিক ট্যাঙ্কটিই বিশ্বের ইতিহাসের সবচেয়ে দৈত্যাকার ট্যাঙ্ক। যার ব্যারেলের দৈর্ঘ্যই ৬৫ ফুট! যেখানে আজকের সাধারণ ট্যাঙ্কের দৈর্ঘ্য হয় মাত্র ২০-২৫ ফুট। পারমাণবিক মিসাইল সজ্জিত এই ট্যাঙ্ক হামলা চালাতে পারত ৪৫ কিলোমিটার দূর থেকে। তবে এই দৈত্যাকার আয়তনই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল বিপদের। বোমা নিক্ষেপের প্রতিক্রিয়া বলের দরুন কয়েকটি শেল নিক্ষেপের পরেই অকেজো হয়ে যেত এই যন্ত্রের মোটর। কাজেই অল্পদিনের মধ্যে বাতিল হয়ে যায় এই যুদ্ধযানটি।

/১১

১কে১৭ শাটিয়া— লেজার রশ্মি দিয়ে পৃথিবীর মানব সভ্যতা তছনছ করে দিচ্ছে ভিনগ্রহীদের যান। সাই-ফাই মুভিতে হামেশাই দেখা যায় এই ছবি। তবে ১৯৫৭ সালে এমনই একটি যন্ত্রের জন্ম দিয়েছিলেন সোভিয়েত বিজ্ঞানীরা। ১কে১৭ শাটিয়া সেই লেজার ট্যাঙ্ক। দেখতে সাধারণ ট্যাঙ্কের মতোই। তবে তাতে ব্যারেলের পরিবর্তে ছিল ১৩টি শক্তিশালী লেজার আলো। সিন্থেটিক রুবি লেন্সের মাধ্যমে কেন্দ্রীভূত হয়ে তার আলো চোখ ধাঁধিয়ে দিত শত্রুপক্ষের সৈনিকদের। পাশাপাশি কেন্দ্রীভূত আলোর উচ্চ তাপশক্তি শত্রুপক্ষের মিসাইল বা বোমায় বিস্ফোরণ ঘটানোর ক্ষমতা রাখত। জেনেভা সম্মেলনের শর্তানুযায়ী, অন্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতার জন্য বায়ো-ওয়েপেনের আওতায় ফেলা হয় এই যুদ্ধযানকে। নিষিদ্ধ হয়ে যায় ১কে১৭ শাটিয়া।

/১১

জেনো প্রোজেক্ট— ১৯৩০-এর দশক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হতে তখন বছর দশেক। আকাশপথে আক্রমণই ভবিষ্যতে যুদ্ধজয়ের চাবিকাঠি— তা ভালোই বুঝেছিল সোভিয়েত। আর সেই কারণেই একাধিক পরীক্ষামূলক বিমান তৈরি করেছিলেন সোভিয়েত বিজ্ঞানীরা। তেমনই একটি বিমান জেনো প্রোজেক্ট। আজ এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার জাহাজের কথা সকলেই জানি আমরা। জেনোও ছিল তেমনই। তবে তা ছিল উড়োজাহাজ। দৈত্যাকার এই প্লেনে ৫টি ছোটো যুদ্ধবিমান আটকানোর জায়গা ছিল। ছিল জ্বালানি ভরার বন্দোবস্তও। এই ক্যারিয়ারের মাধ্যমে যুদ্ধবিমান সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে অবতরণের পরিকল্পনা ছিল রাশিয়ার। তাতে বাঁচত জ্বালানি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুর দিকেই ব্যবহৃত হয়েছিল এই বিমান। পরে প্রযুক্তির উন্নতিতে বাতিল হয়ে যায় জেনো প্রোজেক্ট।

/১১

মিল মি১০— ঠিক যেন দীর্ঘাকার রণপায়ের ওপর চেপে বসেছে একটি হেলিকপ্টার। হ্যাঁ, মিল মি১০-এর আকার-আকৃতি ছিল এমনটাই। ৩০ ফুট উঁচু এই হেলিকপ্টারের চারটি চাকার মধ্যে থাকত একটি ধাতব পাটাতন। ১৫ টন ওজনের সামগ্রী বাক্সবন্দি করে অনায়াসেই নিয়ে যেতে পারত এই হেলিকপ্টার। এমনকি আস্ত একতলা বাড়িকেই এক জায়গা থেকে অন্যত্র স্থানান্তরিত করার ক্ষমতা ছিল এই চপারের। সব মিলিয়ে ৫৫টি এই ধরনের হেলিকপ্টার তৈরি করেছিল রাশিয়া। যার মধ্যে কিছু হেলিকপ্টার ব্যবহৃত হয়েছে ২০১৫ সাল পর্যন্ত।

/১১

কে৮৪ ইকাতেরিনবার্গ— ১৯৬০-১৯৯১— এই তিন দশকে সবমিলিয়ে ২৪৫টি নিউক্লিয়ার পাওয়ারড সাবমেরিন তৈরি করেছিল সোভিয়েত। তার মধ্যে অন্যতম কে৮৪ ইকাতেরিনবার্গ। শুধু দৈত্যাকার আয়তনের জন্যই নয়, ইকাতেরিনবার্গের মধ্যে ছিল দু-দুটি পারমাণবিক চুল্লি। এক সঙ্গে ১৬টি পারমাণবিক মিসাইল বহনে সক্ষম ৫৫০ ফুট দীর্ঘ এই সাবমেরিন ২০১১ সালে আরও একটি চের্নোবিল দুর্ঘটনার জন্ম দিতে পারত। ঝালাইয়ের কাজ চলার সময় আগ্নিকাণ্ডের শিকার হয় এই বিশাল সাবমেরিনটি। গোটা ডুবোজাহাজে আগুন ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগে মাত্র কয়েক ঘণ্টা। তবে দমকলকর্মীদের সারাদিনের চেষ্টায় নিয়ন্ত্রণে আসে আগুন। তখন পর্যন্ত অক্ষত ছিল সাবমেরিনের কেন্দ্রে থাকা পারমাণবিক চুল্লিগুলি।

/১১

এম১৫ বেলফিগার— ‘বিশ্বের সবচেয়ে কুৎসিত বিমান’ হিসাবেই পরিচিত সোভিয়েতের তৈরি এই আকাশযান। তবে এটি কোনো যুদ্ধযান নয়। কৃষিক্ষেত্রে রাসায়নিক কীটনাশক ও সার ছড়ানোর জন্যই তৈরি হয়েছিল এই বিমান। ব্যবহৃত হয়েছিল জেট ইঞ্জিন ও বাই-প্লেন বা দ্বিতল পাখনা। তবে দ্রুত গতিই কাল হয়ে দাঁড়ায় বেলফিগারের। তাতে কীটনাশক ছড়ানোয় সমস্যা হওয়ায় খুব অল্পদিনের মধ্যেই বাতিল হয়ে যায় এই দ্বিতল বিমান।

/১১

লুন-ক্লাস ইকরানোপ্লান— ঠান্ডা যুদ্ধের সময় নির্মিত সোভিয়েতের অদ্ভুতদর্শন যুদ্ধযানগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল ইকরানোপ্লান। আটটি জেট ইঞ্জিন চালিত এই বিমানের ডানার দৈর্ঘ্য ছিল ১৪৪ ফুট। ২৪২ মিটার দীর্ঘ এই বিমান শুধু আকাশপথেই নয়, সমুদ্রে ‘সাঁতার’ কাটাতেও ছিল সমানভাবে সাবলীল। তবে জল স্পর্শ না করে, সমুদ্রতলের কয়েক ইঞ্চি ওপর দিয়ে ভাসত ইকরানোপ্লান। সর্বোচ্চ গতি ছিল প্রায় সাড়ে পাঁচশো কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা। সেইসঙ্গে ৬টি পারমাণবিক মিশাইল লঞ্চপ্যাডের উপস্থিতি আরও ঘাতক করে তুলেছিল এই যুদ্ধযানকে। ১৯৮৭ সালে সোভিয়েত বাহিনীতে যুক্ত হয় ইকরানোপ্লান। তবে সোভিয়েত ভেঙে যাওয়ার পরই এই যুদ্ধাস্ত্রের ব্যবহার বন্ধ হয়।

/১১

প্রোজেক্ট ইকিপ— আজও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তেই হঠাৎ হঠাৎ চাউর হয় ইউএফও দর্শনের কথা। তবে শুধু ভিনগ্রহীরা নয়, সোভিয়েতের গবেষকরাও বানিয়ে ফেলেছিলেন ইউএফও। আদতে যা ডানাহীন বিমান। এয়ার কুশন প্রযুক্তিতে তৈরি এই বিমানের আকৃতি ছিল উপবৃত্তাকার। প্রতি কিলোমিটার-ব্যক্তিতে মাত্র ১৪ গ্রাম জ্বালানি লাগত এই যন্ত্রের। যেখানে সাধারণ বিমান সমপরিমাণ কাজের জন্য নিত ৪৫ গ্রাম জ্বালানি। পাশাপাশি ৪০০ যাত্রী ছাড়াও গাড়ি অন্যান্য সামগ্রীও বহন করতে সক্ষম ছিল এই যন্ত্র। কিন্তু সোভিয়েতের পতনের সঙ্গে সঙ্গেই বন্ধ হয়ে যায় প্রোজেক্ট ইকিপ। যদিও রুশ মিলিটারি গবেষণাকেন্দ্রে আজও অস্তিত্ব বজায় রেখেছে তার প্রোটোটাইপ।

১০/১১

জিভিএম-২৯০১— প্রযুক্তির উন্নতিতে সাঁজোয়া গাড়ির আকারে বহু পরিবর্তন এসেছে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে। সাধারণ টায়ারযুক্ত চাকার বদলে এসেছে চেন লাগানো ধাতব চাকা। কিন্তু স্ক্রু? হ্যাঁ, চাকার পরিবর্তে ট্যাঙ্কে স্ক্রু দিয়েই জিভিএম যুদ্ধযানটি তৈরি করেছিলেন সোভিয়েত গবেষকরা। কর্দমাক্ত অঞ্চলে এমনকি জলের ওপরেও চলাফেরা করতে পারত এই যন্ত্র। তবে সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় তার স্ক্রু-আকৃতির চাকা। তা তৈরির খরচও যেমন ছিল সাধ্যের বাইরে, তেমনই ধীরে গতির পিছনেও দায়ী ছিল এই চাকাই। সেই কারণেই ১৯৮৯ সালে বাতিল হয়ে যায় জিভিএমের প্রকল্প।

১১/১১

জার ট্যাঙ্ক— এই যন্ত্রটি অবশ্য সোভিয়েতের তৈরি নয়। সোভিয়েতের জন্মের আগেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় রাশিয়ায় তৈরি হয়েছিল এই বিশেষ ট্যাঙ্ক। একদিকে নয়, সামনে পিছনে, দু’পাশে এমনকি উপরেও গুলি চালাতে পারত এই যুদ্ধযান। আর তার উচ্চতা ছিল প্রায় তিন তলা বাড়ির সমান। শুধু সামনের চাকার ব্যাসার্ধই ছিল ১৬ ফুট। কিন্তু পিছনের চাকা ছিল অত্যন্ত ছোটো। প্রকাণ্ড ধাতব এই যানের ওজন রাখতে না পেরে যুদ্ধক্ষেত্রে হামেশাই বসে যেত পিছনের চাকাটি। কাজেই ১৯১৭ সালে ব্যবহার ও উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায় এই যানের।

Powered by Froala Editor