রাষ্ট্রনেতার ‘বিষণ্ণ’ ছবিপ্রকাশ নিষিদ্ধ, ফতোয়া জারি করেছিল সোভিয়েত

মাথা নত করে চেয়ারে বসে রয়েছেন জোসেফ স্তালিন। চোখে মুখে স্পষ্ট উদ্বেগের ছাপ। দেখেই বোঝা যাবে, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত তিনি। হাতের তালুতে শক্ত করে ধরে রেখেছেন গোলাকার পেপার ওয়েট। সেখানেও প্রকাশ পাচ্ছে তাঁর অস্থিরতা। ইন্টারনেটে স্তালিনের (Stalin) ছবি সার্চ করলেই এক রাশ ছবি মেলে গম্ভীর কিংবা হাস্যরত অবস্থার। কিন্তু তাঁর এহেন বিষণ্ণ অবস্থার দ্বিতীয় কোনো ছবি খুঁজে পাওয়াই দুষ্কর। কেন ভেঙে পড়েছিলেন ‘দ্য ম্যান অফ স্টিল’ (The Man Of Steel)? কিংবা এমন প্রশ্নও উঠতে পারে, গোটা জীবনে কি আর কখনই তাঁর মনে দানা বাঁধেনি অবসাদ?

এইসব প্রশ্নের উত্তর এবং এই ছবির গল্পে যাওয়ার আগে বুঝে নিতে হবে এই ছবি তোলার সময়কালটাকে। সেটা ১৯৩৯ সাল। তখনও পর্যন্ত হিটলার স্তালিনের প্রধান শত্রু হয়ে ওঠেননি। বরং, দুই স্বৈরশাসক হাত মিলিয়েছেন অলিখিতভাবে। বলতে গেলে, হিটলারের সঙ্গে স্তালিনের চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পরেই, পোল্যান্ড আক্রমণ করেন হিটলার। তাতে স্পষ্ট মদত ছিল সোভিয়েতের। স্তালিন নিজেও পশ্চিম পোল্যান্ড আক্রমণের নির্দেশ দিয়েছিলেন সোভিয়েত বাহিনীকে। দখল নিয়েছিলেন পোল্যান্ডের পশ্চিমাঞ্চল, এস্তোনিয়া, লিথুয়ানিয়া, ফিনল্যান্ড এবং রোমানিয়ার বেশ কিছু অংশের। 

১৯৩৯-এর ১ সেপ্টেম্বর মাসে হিটলারের পোল্যান্ড আক্রমণের পর পরই নাৎসি জার্মানির বিরুদ্ধে যৌথভাবে যুদ্ধ ঘোষণা করে ফ্রান্স এবং ব্রিটেন। শুরু হয় বিশ্বযুদ্ধ। ইউরোপে হিটলার-বিরোধী জোট অবশ্য গড়ে উঠেছিল তারও আগে। অবশ্য প্রথম থেকে সেই জোটে ছিলেন না স্তালিন। রাজনৈতিক ডামাডোলের মধ্যে জার্মানিকে ছেড়ে সোভিয়েতকে সরাসরি আক্রমণ করবে না ব্রিটেন এবং ফ্রান্স— তা তাঁর কাছে স্পষ্ট ছিল প্রথম থেকেই। অন্যদিকে হিটলারের সঙ্গে চুক্তি থাকায় জার্মানির থেকেও নিরাপদ সোভিয়েত। ফলত, অন্যত্র রাজ্যবিস্তারেই মনোনিবেশ করেছিলেন রাশিয়ার স্বৈরশাসক।

তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত বদলাতে থাকে যুদ্ধের পরিস্থিতি। দূত পাঠিয়ে তো বটেই, হিটলারের সোভিয়েত আক্রমণের সম্ভাবনার ব্যাপারে স্তালিনকে সতর্ক করতে নিজে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসেন উইনস্টন চার্চিল। তবে সেই সতর্কতাকে ততটাও আমল দেননি তিনি। এমনকি নাৎসি বাহিনী ক্রমশ ইউক্রেন সীমান্ত ছাড়িয়ে ভেতরের দিকে কয়েকশো মাইল ঢুকে আসার পরেও টনক নড়েনি তাঁর। 

আরও পড়ুন
ইউক্রেনের গণকবর খুঁড়ে তুলছে স্তালিনের নৃশংসতার স্মৃতি

সেই ভুল ভাঙে ১৯৪১ সালে। স্তালিন তখন ক্রেমলিনের অফিসে। বার্তা আসে জার্মান বাহিনী ঢুকে পড়েছে সোভিয়েতে। নাৎসি আক্রমণের শিকার কিয়েভ শহর। প্রযুক্তিই হোক কিংবা পরাক্রমশীলতা কোনোদিন থেকেই অতর্কিত এই আক্রমণকে ঠেকাতে পারছে না রেড আর্মি। স্তালিনের কাছে তখনও বিকল্প পরিকল্পনা বা প্ল্যান-বি বলে কিছুই নেই। সোভিয়েতের সেনা বাহিনীর একটা বড়ো অংশ তখনও রাষ্ট্রের অন্য প্রান্তে। এমন অবস্থায় যেন আকাশ ভেঙে পড়েছিল স্তালিনের মাথায়। অসহায় হয়ে পড়েছিলেন ‘ইস্পাতমানব’। বিশ্বাস ভেঙে পড়ার যন্ত্রণা নেহাত কম নয়। তারপর বাকিটা ইতিহাস। বিশ্ব সাক্ষী হয়েছিল ইতিহাসের সবথেকে ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের। সোভিয়েত তো বটেই, অপারেশন বারবারোসায় মুখ থুবড়ে পড়েছিল গোটা মিত্রশক্তির সেনাবাহিনী। নাৎসিদের হাতে বন্দি হয়েছিল কমপক্ষে ৫০ লক্ষ রেডআর্মির সেনা। তাঁদের অধিকাংশই প্রাণে বেঁচে ফেরেননি জার্মানি থেকে। 

আরও পড়ুন
নিজের সেনাবাহিনীর ওপরেই গুলিবর্ষণ, স্তালিনের নির্দেশে রেড-আর্মির ‘জেনোসাইড’

ক্রেমলিনের অফিসে সেদিন এই ছবিটি তুলেছিলেন রাশিয়ার দৈনিক সংবাদপত্র কমসোমলস্কায়া প্রভদা-র মুখ্য সম্পাদক। একটি নয়, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত স্তালিনের বেশ কয়েকটি ছবি তুলেছিলেন তিনি। তবে, সেসব ছবি প্রকাশ করার সুযোগ পাননি তিনি। দেশের সর্বশক্তিমান রাষ্ট্রনেতার এমন ছবি প্রকাশে পেলে, ভাবমূর্তিতে কালি লাগবে। তাই ছবি প্রকাশের আগেই সেগুলির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন সোভিয়েত প্রশাসন। ছবিগুলি নষ্ট করে দিতে বাধ্য করা হয়েছিল সংশ্লিষ্ট চিত্রসাংবাদিককে। তবে প্রশাসনের আদেশ অমান্য করেই একটি ছবি গোপনে সরিয়ে রেখেছিলেন তিনি। পরবর্তীকালে স্তালিনের মৃত্যুর পর প্রকাশ্যে আসে ছবিটি। যদিও, সোভিয়েত প্রশাসন দাবি করেছিল এই ছবি আসল নয়। যান্ত্রিক কারিগরিতে তা তৈরি করা হয়েছে। তবে ছবির সময়কাল এবং সংশ্লিষ্ট চিত্রসংগ্রাহকের লিখিত বয়ান অন্য কথাই বলে। তার সঙ্গে হুবহু মিলে যায় তৎকালীন ইউরোপের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও। বলার অপেক্ষা থাকে না, অসহায়তার থাবা থেকে মুক্তি পাননি দোর্দণ্ডপ্রতাপ ‘ম্যান অফ স্টিল’-ও…

Powered by Froala Editor

More From Author See More