বিশ্বকাপের একমাত্র ভারতীয়-বংশোদ্ভূত ফুটবলার তিনি, কোথায় হারিয়ে গেলেন ‘সাবস্টিটিউট’?

২০০৬ সাল। ৯ জুলাই। সেদিন ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে অন্যতম নাটকীয় ফাইনালের সাক্ষী হয়েছিল বার্লিনের ওলিম্পিয়াস্টেডিওনে হাজির সকল দর্শক। ম্যাচ শুরুর ৯ মিনিটে জিদানের পেনাল্টিতে ফ্রান্স এগিয়ে গেলেও ১৯ মিনিটের মাথায় ম্যাচের সমতা ফেরান ইতালির মাতেরাজ্জি। পরবর্তী ৭০ মিনিটে আর গোল হয়নি কোনো। এক্সট্রা টাইমেও ম্যাচের ফলাফল থেকে যায় ১-১। এরই মাঝে মাতেরাজ্জিকে গুঁতো মেরে লালকার্ড দেখে বসেন ফ্রান্সের নায়ক জিনেদিন জিদান। শেষ পর্যন্ত পেনাল্টি শ্যুট-আউটে ফ্রান্স বধ করে বিশ্বকাপ ঘরে তোলে ইতালি।

সেদিন এই নাটকীয় হারের পর, মালুডা, রিবেরি, লিলিয়ান, দিয়ারার সঙ্গে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন ফ্রান্সের রিজার্ভ বেঞ্চে বসে থাকা এক ভারতীয় বংশোদ্ভূত (Indian-Origin) খেলোয়াড়-ও। হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন। বিশ্বকাপের মঞ্চে ভারতীয়! শুনতে একটু অবাক লাগাই স্বাভাবিক। কারণ, জিদানের ঢুঁসো নিয়ে এ-দেশের মিডিয়ায় মাতামাতি হলেও, সম্পূর্ণ ব্রাত্য থেকে যান তিনি। 

বিকাশ রাও ধরাসু (Vikash Rao Dhorasoo)। ৮ নম্বর জার্সি পরেই বিশ্বকাপের মঞ্চে খেলতে নেমেছিলেন এই ভারতীয় বংশোদ্ভূত মিডফিল্ডার। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ সুইজারল্যান্ড ও দ্বিতীয় ম্যাচে দক্ষিণ কোরিয়ার বিরুদ্ধে মাঠে নামতে দেখা গিয়েছিল তাঁকে। তবে দুটি ম্যাচেই প্রথম একাদশে সুযোগ পাননি ধরাসু। ৬০ মিনিটের পর সাবস্টিটিউট হয়ে নেমেছিলেন মাঠে। ছাপ রেখে গিয়েছিলেন উজ্জ্বল উপস্থিতির। এমনকি সুইজারল্যান্ডের বিরুদ্ধে মাত্র কয়েক ইঞ্চির জন্য গোল পাননি তিনি। বাকি টুর্নামেন্ট গোটাটাই তাঁকে কাটাতে হয়েছিল রিজার্ভ বেঞ্চে বসে। কিন্তু ২০০৬ সালের বিশ্বকাপের পর কোথায় হারিয়ে গেলেন বিকাশ? 

এই প্রশ্নের উত্তরে যাওয়ার আগে, প্রাক্তন ফরাসি খেলোয়াড়ের পরিচয় দিয়ে রাখার প্রয়োজন আছে বৈকি। ১৯৭৩ সালে নরম্যান্ডিতে জন্ম বিকাশের। বড়ো হয়ে ওঠা হার্ফ্লেউর এক ইন্দো-মরিশীয় পরিবারে। ধরাসুর বাবা ছিলেন ভারতীয়। অন্ধ্রপ্রদেশের বাসিন্দা। অন্যদিকে মা ছিলেন মরিশিয়ান। শৈশবে মূলত ক্রিকেট ও ব্যান্ডমিন্টন খেললেও, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফুটবলের প্রতি আগ্রহ বাড়ে বিকাশের। সেইসঙ্গে অল্প বয়স থেকেই আগ্রহ ছিল রাজনীতি আর বলিউডে। 

ধরাসুর ফুটবল কেরিয়ার শুরু হয়েছিল নরম্যান্ডির ‘লা হাভরে’ ক্লাব থেকে। টানা পাঁচ বছর এই ক্লাবে খেলার পর, ১৯৯৮ সালে ফরাসি ক্লাব লিঁও-র সঙ্গে চুক্তি হয় তাঁর। এর বছর খানেকের মধ্যেই সুযোগ আসে ফ্রান্সের জাতীয় দলে খেলার। ১৯৯৯ সালে প্রথম ফ্রান্সের জার্সিতে মাঠে নামেন ধরাসু। জাতীয় শিবিরের হয়ে মাত্র দুটি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার সৌভাগ্য হয়েছিল সেই মরশুমে। এরপর জাতীয় দল থেকে বাদ পড়লেও, ফের ২০০৪ সালে প্রত্যাবর্তন করেন তিনি। বেশ প্রতাপের সঙ্গেই। তখন তাঁর বয়স ৩২ বছর। বিশ্বকাপের কোয়াইলিফাইং রাউন্ড অর্থাৎ যোগ্যতা অর্জন পর্বে প্রত্যেকটি ম্যাচেই প্রথম একাদশে দেখা গিয়েছিল তাঁকে। এমনকি সাইপ্রাসের বিরুদ্ধে কোয়ালিফাইং ম্যাচে দেশের হয়ে গোলও করেছিলেন তিনি। খুব স্বাভাবিকভাবেই তাই ৮ নম্বর জার্সি জুটেছিল বিশ্বকাপ স্কোয়াডের জন্য। তবে গোটা টুর্নামেন্টই ‘সাবস্টিটিউট’ হয়ে কাটাতে হয় তাঁকে। 

বিশ্বকাপের পরই ফরাসি কোচ রেমন্ড অ্যালবার্ট ডোমেনিচের উপর ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছিলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত মিডফিল্ডার। তাঁর রোষের শিকার হয়েছিল ফরাসি ফুটবল ফেডারেশনও। সেইসঙ্গে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকেও অবসর নেন তিনি। অবশ্য ফরাসি ক্লাব পিএসজিতে বেশ কিছুদিন খেলা চালিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। ২০০৭ সালে ইতালির ক্লাব লিভরনোর চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করলেও, চোটের কারণে খেলতে পারেননি একটিও ম্যাচ। সেখানেই ইতি পড়ে তাঁর ক্লাব ক্যারিয়ারে। এখানে বলা রাখা দরকার, শুধু বিশ্বকাপই নয়, ২০০৩-২০০৪ সালে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে এসি মিলানের হয়ে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে খেলেছেন বিকাশ। এমনকি ২০০৪ সালে রানার্স আপ হয়েছিল তাঁর দল। 

ফুটবলকে বিদায় জানিয়ে এরপর সংস্কৃতির জগতে পা দেন বিকাশ। চলচ্চিত্র, সাহিত্য, রাজনীতি— প্রতিক্ষেত্রেই ছাপ রেখেছে তাঁর উপস্থিতি। ২০০৬ বিশ্বকাপের স্মৃতি এবং নিজের অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করেই নির্মাণ করেছিলেন ‘সাবস্টিটিউট’ নামের একটি চলচ্চিত্র। বিজয়ী দলের রিজার্ভ বেঞ্চে বসে থাকা খেলোয়াড়দের মানসিক অবস্থা এবং আকাঙ্খার বিষয়টি উঠে এসেছিল এই চলচ্চিত্রে। তাছাড়া ‘লা’এনগেজমেন্ট’, ‘বুটেক’-সহ বেশ কয়েকটি কৌতুক-গ্রন্থ লিখেছেন প্রাক্তন ফুটবলার। 

আন্তর্জাতিক ফুটবলের মঞ্চ থেকে বিদায় নেওয়ার পর ভারতীয় সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ে বিকাশের। ২০০৬ সালের পর একাধিকবার ভারতে এসেছেন। এ-দেশে আন্তর্জাতিক মানের ফুটবল অ্যাকাডেমির পরিকাঠামো গড়ে তুলতে একাধিক আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন তিনি। দেখা করেছেন বাইচুং কিংবা রেনেডি সিং-এর মতো ভারতীয় তারকাদের সঙ্গে। পরবর্তীতে দরিদ্র ভারতীয় শিশুদের জন্য ব্যক্তিগত উদ্যোগে বেশ কয়েকটি প্রকল্পও শুরু করেন প্রাক্তন ফুটবলার। তাছাড়াও অংশ নেন দারিদ্র অবসানের জন্য বিভিন্ন প্রচারাভিযানে। একইসঙ্গে ফ্রান্সে ক্রীড়াজগতের বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়তে সমকামী ফুটবল ক্লাব ‘প্যারিস ফুট গে’-কেও প্রকাশ্য সমর্থন জানিয়েছিলেন বিকাশ। আজও যে ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন তিনি। সবমিলিয়ে ফুটবলের ইতিহাসের এক বর্ণময় চরিত্র বিকাশ ধরাসু।

ভারতীয়রাও যে আন্তর্জাতিক ফুটবলের মঞ্চে মাঠ দাপাতে পারে তার অন্যতম উদাহরণ তিনি। উপযুক্ত পরিষেবা এবং প্রশিক্ষণ পেলে ভারতও একদিন বিশ্বকাপের মঞ্চে সুযোগ পেতে পারে, এমন ভবিষ্যদ্বাণীও শোনা গিয়েছিল তাঁর মুখে। এ-কথা অস্বীকার করার জায়গা নেই, সুনীল ছেত্রীর মতো স্ট্রাইকাররা বিকাশ ধরাসুর সহযোগিতা পেলে বর্তে যেত ভারতের ভাগ্য। বিশ্বকাপ অভিযানে সামিল না হলেও, আজকের দিনে কি এশিয়ান জয়ের স্বপ্ন দেখতে পারতাম না আমরা?

Powered by Froala Editor

More From Author See More

Latest News See More