মাত্র একদিনের জন্য আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন যে ব্যক্তি

আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র। পৃথিবীর শক্তিশালী দেশগুলির মধ্যে একদম প্রথম সারিতে। এ হেন দেশের প্রেসিডেন্টের চেয়ারে যিনিই বসবেন, তিনিই প্রভূত ক্ষমতার অধিকারী। সেই চিন্তা নিয়েই একজন এসেছিলেন আসনে। সমস্ত আমেরিকাবাসীরই স্বপ্ন থাকে এখানে আসার; আর তাঁর সামনে সেই স্বপ্ন সত্যি হওয়ার মুখে। কিন্তু তিনি এও জানতেন, এই মুহূর্ত বেশিদিন থাকবে না। চার বছর নয়; তাঁর কাছে এই চেয়ারের মেয়াদ মাত্র এক দিন!

এই মুহূর্তে আমেরিকার দিকে তাকিয়ে আছে গোটা দেশ। ডোনাল্ড ট্রাম্প বনাম জো বিডেন— মার্কিন প্রেসিডেন্টের পদ ছিনিয়ে নেবেন কে? আরও কিছুক্ষণের অপেক্ষা তো করতেই হবে। ফলাফল যাই হোক; মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সঙ্গে এই প্রেসিডেন্ট পদের লড়াইও জুড়ে আছে প্রবলভাবে। আর সেই সূত্র ধরেই উঠে আসবে ১৭০ বছর আগের এক অদ্ভুত পরিস্থিতির কথা। আর যার সঙ্গে জুড়ে আছেন ডেভিড রিচ অ্যাটচিসন— একদিনের মার্কিন প্রেসিডেন্ট… 

সাল ১৮৪৯। গত বছরের নভেম্বরেই সম্পন্ন হয়েছে সেইবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। লড়াইয়ে জিতে ১২তম মার্কিন রাষ্ট্রপতির পদের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন জ্যাকারি টেলর। এবার আগামী চার বছর তিনি দেশ চালাবেন। তবে আমেরিকার নিয়ম অনুযায়ী, জেতার সঙ্গে সঙ্গেই প্রেসিডেন্টের চেয়ারে বসেননি জ্যাকারি টেলর। পরের বছর অর্থাৎ ১৮৪৯ সালের মার্চে পূর্বতন রাষ্ট্রপতি জেমস কে পোক অবসর নেওয়ার পরই তিনি শপথগ্রহণ করবেন। ততদিন পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা থাকবে আগের জনের কাছেই… 

নিয়ম অনুযায়ী, ১৮৪৯ সালের ৪ মার্চ, রবিবার জ্যাকারি টেলরের প্রেসিডেন্ট পদে শপথ নেওয়ার কথা। কিন্তু বেঁকে বসলেন তিনি। ওই দিনটি ছিল সাব্বাথের। কাজেই এই দিনটিকে কোনোভাবেই নষ্ট করতে চান না তিনি। ঠিক হল পরের দিন, অর্থাৎ ৫ মার্চ দায়িত্ব নেবেন জ্যাকারি… 

কিন্তু ৪ মার্চেই যে চেয়ার ছেড়ে দেবেন প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি জেমস কে পোক। তাহলে ওই একটা দিন কে সামলাবে দায়িত্ব? এই নিয়েই শুরু হল বৈঠক। প্রেসিডেন্ট, ভাইস প্রেসিডেন্ট কেউই দায়িত্ব নিতে পারছেন না ৪ তারিখ। তাহলে উপায়? আমেরিকার একটি রাজ্যের সেনেটরের হাতেই একটা দিনের জন্য রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব দেওয়া হোক। অতঃপর, সেই বৈঠকেই উঠে এল মিসৌরির সেনেটর ডেভিড রিচ অ্যাটচিসনের নাম। ‘প্রেসিডেন্ট প্রো টেম্পোর’ হিসেবে মাত্র একদিনের জন্য আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হলেন তিনি। একইসঙ্গে দেশের ইতিহাসের পাতায়ও তিনি উঠে গেলেন, বরাবরের মতো। মিসৌরির প্ল্যাটসবার্গের গোরস্থানে গেলে অ্যাটচিসনের সমাধিফলকেও জ্বলজ্বল করছে সেই পরিচয়। ‘ইনিই সেই ব্যক্তি, যিনি মাত্র একদিনের জন্য আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন’… 

কিন্তু এখানেই হল একটি অদ্ভুত ঘটনা। ডেভিড অ্যাটচিসন নিয়মমাফিক শপথগ্রহণ করেননি সেই সময়। তাঁর যুক্তি ছিল, মাত্র একদিনের জন্য তিনি এসেছেন এখানে যাতে চেয়ারটা শূন্য না থাকে। তিনি তো নির্বাচনে লড়ে প্রেসিডেন্টের পদ পাননি। কাজেই শপথগ্রহণ করা উচিত নয় তাঁর। অকাট্য যুক্তি। কিন্তু পরেরদিন দুপুরে, জ্যাকারি টেলর যখন শপথগ্রহণ করেন, তখন বলা হয় প্রথামাফিক ৪ মার্চ থেকেই তিনি দায়িত্বে এসেছেন। তাহলে কী হল ব্যাপারটা? একই দিনে দুজন বসে আছেন আমেরিকার রাষ্ট্রপতির চেয়ারে! 

আরও পড়ুন
১৫০ বছর ধরে মার্কিন নির্বাচনের ‘প্রতীক’ হাতি আর গাধা; কোন গল্প লুকিয়ে এর পিছনে?

একইরকম ঘটনা ঘটে ১৮৭৭ সালে। ৩ মার্চে হোয়াইট হাউসে উপস্থিত হলেন তিনজন। বিদায়ী প্রেসিডেন্ট ইউলিসিস গ্রান্ট, প্রধান বিচারপতি মরিসন আর ওয়েট এবং নির্বাচিত নতুন প্রেসিডেন্ট রাদারফোর্ড হায়েস। কয়েকবছর আগেই নিহত হয়েছেন আব্রাহাম লিঙ্কন। গৃহযুদ্ধ চলেছে আমেরিকায়। শেষ হয়ে যাওয়ার পরও পরিস্থিতি ছিল উত্তপ্ত। এমন অবস্থায় হোয়াইট হাউজের গোপন কক্ষে বৈঠক শুরু করলেন তিনজন। 

পরেরদিন আনুষ্ঠানিকভাবে নিজের দায়িত্ব থেকে অব্যহতি নেবেন ইউলিসিস গ্রান্ট। আর তারপর শপথ নেবেন হায়েস। কিন্তু এবার গ্রান্ট ঠিক করলেন, যা পরিস্থিতি তাতে গোপনেই শপথগ্রহণ হয়ে যাক। প্রধান বিচারপতি তো সঙ্গেই আছেন! যেমন ভাবা তেমনি কাজ। ৩ মার্চের রাতেই, হোয়াইট হাউজের ভেতর রাষ্ট্রপতির শপথ নিলেন মরিসন হায়েস। ওই কয়েক ঘণ্টার জন্য আমেরিকা আবারও পেল দুজন প্রেসিডেন্ট! এভাবেই বহু ঘটনার ঘনঘটা তৈরি হয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে ঘিরে। এবারে কী হয়, সেটাই দেখার পালা… 

Powered by Froala Editor

আরও পড়ুন
ভোটে কারচুপি, ডুয়েল কিংবা অতর্কিত মৃত্যু; মার্কিন নির্বাচনের সঙ্গে জড়িয়ে হাজারো কালো অধ্যায়