একুশ শতকে দাঁড়িয়েও 'অচ্ছুৎ', অবলুপ্তির কিনারে দাঁড়িয়ে মুশাহার সম্প্রদায়

ছোট্ট মাটির বাড়ি। খাট পাতার জায়গাটুকু নেই। তাও সেই বাড়িতেই প্রতি বর্ষায় ঢুকে পড়ে বন্যার জল। কখনও ধ্বসে পড়ে আস্ত বাড়ি। পাকা বাড়ি তৈরি তো দূরের কথা, দুবেলা দুমুঠো খাবার জোটাতেই নাভিশ্বাস ওঠে তাঁদের। উপার্জনের কোনো পথও নেই তাঁদের। নেই কাজ দেওয়ারও কেউ। একুশ শতকে দাঁড়িয়েও তাঁরা অচ্ছুৎ আজকের সমাজে।

মুশাহার (Mushahar) সম্প্রদায়। বিহার, মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ এবং ছত্তিশগড়— মূলত এই চার রাজ্যেই বাস মুশাহারদের। তাছাড়াও বিক্ষিপ্তভাবে বাংলার কিছু অঞ্চলেও দেখা মেলে তাঁদের। মূলত বন্যা এবং সামাজিক নির্যাতনের কারণেই স্বরাজ্য ছেড়ে বাংলায় এসে আশ্রয় নিয়েছেন তাঁরা।

জাতিগত দিক থেকে মুশাহাররা মূলত দলিত। লোককথায় অনুযায়ী, ব্রহ্মার অভিশাপেই তাঁরা জীবিকা হয়ে ওঠে ইঁদুর ধরা ও মারার কাজ। ইঁদুরের মাংস খেতেই পেট চলে তাঁদের। আহার হিসাবে মূষিক-ভক্ষণ— 'মুশাহার' নামের পিছনেও লুকিয়ে রয়েছে সেই গল্প। আর ব্যাধ বা শবর গোত্রের হওয়ার কারণেই প্রথাগত সমাজ বিছিন্ন করে রেখেছে তাঁদের। করে রেখেছে অচ্ছুৎ।

১৮৮১ সাল। ভারতের বুকে সর্বপ্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিগত সার্ভে করেন হার্বার্ট হোপ রিসলি। তাঁর সমীক্ষাতেই প্রথমবারের জন্য উল্লেখিত হয়েছিল মুশাহারদের কথা। 'ট্রাইবস অফ বেঙ্গল' বিভাগে মুশাহারদের 'ভুঁইয়া' বলেই অভিহিত করেছিলেন তিনি। হ্যাঁ, তখন বাংলা বলতে শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়। ছোটোনাগপুরের বিস্তীর্ণ অঞ্চলই ছিল বঙ্গের অভ্যন্তরে। আর সেই কারণেই বঙ্গবাসী বলে তাঁদের চিহ্নিত করেছিলেন হার্বার্ট। 

তাঁর লিখিত নথি অনুযায়ী, আনুমানিক ষোড়শ শতকে গাঙ্গেয় উপত্যকা থেকে স্থানান্তরিত হয়েছিল মুশাহাররা। জায়গা নিয়েছিল ছোটনাগপুরে। তবে এই সমীক্ষা নিয়েও ধন্দ রয়েছে যথেষ্ট। কারণ, হার্বার্ট গাঙ্গেয় উপত্যকায় তাঁদের বসবাসের কথা উল্লেখ করলেও, মুশাহারদের সংস্কৃতি, যাপন, সমাজ-গঠনের সঙ্গে মিল পাওয়া যায় মুণ্ডা, হো, সাঁওতালদের। কাজেই তাঁদের উত্থান হয়েছিল ছোটোনাগপুরেই, এমনটাই দাবি করেন অনেকে।

বর্তমানে তফসিলি সম্প্রদায়ের মধ্যে সবচেয়ে দরিদ্র সম্প্রদায় মুশাহার। সবচেয়ে অবহেলিতও বটে। এমনকি ক্রমাগত কমছে তাঁদের জনসংখ্যা। কেউ প্রাণ বাঁচাতে আশ্রয় নিচ্ছেন ভিন রাজ্যে। করছেন দিনমজুরের কাজ। অন্যেরে এখনও লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন সংস্কৃতি আঁকড়ে বেঁচে থাকার।

বছর কয়েক আগেই এক সমীক্ষা জানিয়েছিল, মুশাহারদের নাকি আগে নিজস্ব ভাষা ছিল। সেই ভাষা অবলুপ্ত হয়েছে বহুদিন। এবার গবেষণা জানাচ্ছে, মুশাহার সংরক্ষণে বিশেষ উদ্যোগ না নিলে ভারতের বুক থেকে সম্পূর্ণভাবে মুছে যেতে পারে আস্ত সম্প্রদায়টির অস্তিত্বই। হাতে আর মাত্র কয়েক দশক...

Powered by Froala Editor