জোট-ঘোঁট-ভোট (৪)

আমার তৈরি প্রশ্নমালাটি মনিশঙ্কর আইয়ারের মোটেই পছন্দ হল না। অবশ্য তার কারণও ছিল, অর্ধেকের বেশি প্রশ্ন ছিল চোখাচোখা, চরম অস্বস্তিকর। মনি অতএব সেটিকে বাদ দিয়ে প্রভু সন্তুষ্ট হন এমন কতগুলি মাখন-মাখা প্রশ্ন আমাকে ডিক্টেট করলেন। তারপর জ্ঞান দিলেন, “উচ্চাশা ভালো তবে অতি-উচ্চাশা কিন্তু সর্বনাশা।”

তার ঘণ্টাখানেক পরে আমি হেলিকপ্টারে উঠলাম, ক্রুদ্ধ, অপমানিত, আত্মগ্লানিতে মাথা নিচু করে। পাতি সব প্রশ্ন করতে হবে, তবু হৃদযন্ত্রের ধুকপুকানি হঠাৎ কয়েক গুণ বেড়ে গেল। ইন্টারভিউ নেব দেশের প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধির। জীবনে সেই প্রথম ও শেষবার আমি সাক্ষাৎকারে এমন সব প্রশ্ন করতে বাধ্য হলাম যা আমার নয়, অন্যের তৈরি করে দেওয়া।

দিল্লিতে আমি প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয় কভার করতাম, মনিশঙ্কর তখন সেখানে যুগ্ম-সচিব, আমার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল এই পদত্যাগী আই এফ এস অফিসারটির সঙ্গেই। সাউথ ব্লকে ওঁর অফিসে আমার নিয়মিত যাতায়াত ছিল, একবার তাঁর বাড়িতে নৈশভোজের আমন্ত্রণও পেয়েছিলাম। এক দারুণ চিত্তাকর্ষক চরিত্র, সুশিক্ষিত, ইংরেজি ভাষার ওপর দখল, বলার কায়দা সত্যিই ঈর্ষণীয়। সর্বোপরি রসিক মানুষ, বঙ্কিম কটাক্ষে যে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বীকে কুপোকাৎ করতে সিদ্ধহস্ত। দুন স্কুলে রাজীবের সমসাময়িক ছিলেন মনিশঙ্কর, সেই সম্পর্কের সুতো ধরেই তাঁর প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ে আসা।

কিন্তু সেদিন দমদম বিমানবন্দরের ভি আই পি লাউঞ্জে আমার সঙ্গে তিনি যে অপ্রত্যাশিত দুর্ব্যবহার করেছিলেন আমি তা ভুলতে পারিনি। নিজের ইচ্ছেমতো দেশের প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্ন করার অধিকার তিনি হঠাৎ কেড়ে নিলেন, একজন স্বাধীনচেতা, নির্ভীক সাংবাদিককে তিনি গায়ের জোরে নিজের স্টেনোগ্রাফারে পর্যবসিত করে ছেড়েছিলেন।

আরও পড়ুন
জোট-ঘোঁট-ভোট (৩)

পরে আমার অনেকবার এর জন্য মনস্তাপ হয়েছে, ভেবেছি আমার হয়তো উচিত ছিল সাক্ষাৎকারটি না নিয়ে বাড়ি ফিরে আসা। কিন্তু সেই মুহূর্তে এমন দুর্জয় সাহস আমি দেখাতে পারিনি, মাথার ভিতর সব কিছু তালগোল পাকিয়ে যাওয়ায় কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গাতেই আমি ছিলাম না। এই অক্ষমতা, আত্মগ্লানি, লজ্জাবোধ হৃদয়ে সেই যে ক্ষত সৃষ্টি করেছিল, এত বছর পরে আজও তা সম্পূর্ণ নিরাময় হয়নি।

১৯৮৭-র বিধানসভা ভোটের প্রচারের সেটাই ছিল শেষ দিন। তার আগে পুনঃপুনঃ রাজীবের ঝোড়ো রাজ্য সফর এমন ধুলোর ঝড় তুলেছিল যে সব কিছুই কেমন অস্পষ্ট দেখাচ্ছিল। কারণ ছিল না, তবু ভোটের মুখে কী হয় কী হয় গোছের জল্পনা রাজ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল, প্রতিপক্ষ দুই শিবিরেই টানটান উত্তেজনা, সংযম, শিষ্টাচারের লক্ষ্মণ রেখার ভিতরে কেউই যেন থাকতে চায় না।

আরও পড়ুন
জোট-ঘোঁট-ভোট (২)

সে বছর রাজীব যতবার পশ্চিমবঙ্গে এসেছিলেন, নিজের নির্বাচনী কেন্দ্র আমেঠিতেও যাননি। আর প্রতিটি সফরে মিডিয়ার একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর সফর-সঙ্গী দলে আমার জায়গাটি ছিল পাকা। আমার সাংবাদিক জীবনে এই অভিজ্ঞতা ছিল মস্তো বড় প্রাপ্তি। আমি রাজীবের বিশেষ বিমানে চড়ে কলকাতায় আসতাম, প্রধানমন্ত্রী গ্রাম-সফরে বের হলে আমার গাড়ির জায়গা হত প্রধানমন্ত্রীর কনভয়ে, রাজীব হেলিকপ্টারে চড়লে আমাকেও জায়গা দেওয়া হত দ্বিতীয় হেলিকপ্টারে, রাত্রিবাস কোথায় করব তা নিয়েও কোনো দুশ্চিন্তা ছিল না। মোদ্দা কথায় রাজীব যা বলছেন বা করছেন সবটাই ঘটছে আমার চোখের সামনে, যা লিখছি সেটাই আনন্দবাজারের এক্সক্লুসিভ। ভাগ্যিস তখনও টেলিভিশন চ্যানেলের দৌরাত্ম্য শুরু হয়নি, মিডিয়া বলতে শুধু খবরের কাগজ আর পশ্চিমবঙ্গে মিডিয়া বলতে এক ও অদ্বিতীয় আনন্দবাজার পত্রিকা। রাজীবের সফরে আমার এমন একচেটিয়া দাদাগিরি মিডিয়ার সতীর্থরা কি ভালো চোখে দেখেছিলেন? উত্তরটি এতই সহজ যে মুখ ফুটে বলার প্রয়োজনই দেখছি না।

পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্টকে ক্ষমতাচ্যুত করা সম্ভব, এমন একটি অবাস্তব ভাবনা অনভিজ্ঞ প্রধানমন্ত্রীর মাথায় কীভাবে প্রবেশ করেছিল, কারা তাঁকে এমন কু-মন্ত্রণা দিয়েছিলেন বলতে পারব না। তৎকালীন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সির নেপথ্যে একটা বড় ভূমিকা ছিল যদিও একমাত্র তা দিয়েই রাজীবের এমন আত্মঘাতী অপচেষ্টা ব্যাখ্যা করা যাবে না। 

আরও পড়ুন
জোট-ঘোঁট-ভোট (১)

এর বাইরেও দু’টি সম্ভাব্য কারণ ছিল। লোকসভায় রেকর্ড আসনে জয়ের গরিমা ম্লান হতে শুরু করেছিল তার অব্যবহিত পর থেকেই। ১৯৮৫-৮৬ সালে কয়েকটি রাজ্যে বিধানসভার ভোট হয়েছিল, কংগ্রেস একটিতেও জিততে পারেনি। ফলে নিজের বিজয়ী ভাবমূর্তি ধরে রাখতে যে কোনো একটি রাজ্যে বিধানসভা দখল রাজীবের কাছে অতি-আবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছিল, ঠিক তার পরের বিধানসভা ভোট ছিল পশ্চিমবঙ্গে, অতএব হিতাহিতজ্ঞান খুইয়ে সেখানেই তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। তাছাড়া এ রাজ্যের লোকসভা ভোটের ফলাফলও রাজীবকে আশাবাদী করে তুলেছিল। তাঁর মনে হয়েছিল, ৪২টি লোকসভা আসনের মধ্যে কংগ্রেস যদি ১৬ টি আসন দখল করতে পারে তাহলে কংগ্রেসের জমি বোধহয় অনেকটাই তৈরি হয়ে আছে। প্রয়োজন শুধু ‘এক ধাক্কা ঔর দো’।

১৯৮৭-র বিধানসভা ভোট হয়েছিল এপ্রিল মাসে। রাজীব সলতে পাকানো শুরু করে দিয়েছিলেন তার অনেক থেকেই। প্রিয়রঞ্জন সহ তাঁর পরামর্শদাতারা প্রধানমন্ত্রীকে এ কথা বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন যে পশ্চিমবঙ্গে বামেদের বিরুদ্ধে অর্থবহ লড়াই করার প্রথম পূর্বশর্তটি হল কেন্দ্রের বঞ্চনার অভিযোগ সম্পর্কে মনোযোগী হওয়া এবং সাধ্যমতো এই রাজনৈতিক ব্রহ্মাস্ত্রটিকে অকেজো করার চেষ্টা করা। স্বাধীনতার অবব্যহিত পর থেকে দ্বিখণ্ডিত পশ্চিমবঙ্গ নানা বিষয়ে কেন্দ্রের পরিকল্পিত বঞ্চনার শিকার হয়েছিল, এই ঐতিহাসিক সত্যটি স্বীকার করার জন্য বামপন্থী হওয়ার কোনো প্রয়োজনও নেই। বাঙালির বঞ্চনাকে সিপিএম সংগঠিত প্রচারের মাধ্যমে ভাবাবেগের ইস্যু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিল অনায়াসে। জ্যোতি বসু যখন প্রকাশ্য জনসভায় একেবারে নিয়ম করে কেন্দ্রীয় সরকারের মাশুল সমীকরণ নীতিকে তুলোধনা করতেন, মানুষ তা বিশ্বাস করত। দেশভাগের চরম ধাক্কার সঙ্গে কেন্দ্রের উদাসীনতা বাংলার মাটিতে কমিউনিস্টদের জনপ্রিয়তা বাড়াতে দারুণভাবে সাহায্য করেছিল। কংগ্রেসের কোনো রকম পাল্টা প্রচার তাতে প্রভাব ফেলতে পারেনি, ‘কেন্দ্রের বিমাতৃসুলভ আচরণ’ হয়ে উঠেছিল বাম-রাজনীতির ‘লিটমোটিভ’।

১৯৮৬-র সেপ্টেম্বরে, বিধানসভা ভোটের আট মাস আগে রাজীব একটি নাটকীয় সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি দিল্লির দরবারটাকেই নিয়ে এলেন কলকাতায়, বিমান বোঝাই হয়ে এক ঝাঁক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও পদস্থ আমলা সঙ্গে এলেন। রাজভবনে জ্যোতিবাবুর রাজ্য প্রতিনিধিদলের সঙ্গে হল ম্যারাথন বৈঠক। প্রধানমন্ত্রীর এমন অকস্মাৎ পাল্টা চালে মহাকরণ সাময়িকভাবে বিভ্রান্ত হয়ে গিয়েছিল, তাঁরা নিজেদের ভালো করে প্রস্তুত করার সময়টুকু পর্যন্ত পাননি। বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রী যৌথ সাংবাদিক বৈঠক করে পশ্চিমববঙ্গের জন্য হাজার কোটি টাকার একটি প্যাকেজ ঘোষণা করলেন, যার মধ্যে বিবিধ প্রকল্পের উল্লেখ ছিল। কিছুকাল পরেই দুধ কা দুধ, পানি কা পানি হয়ে গিয়েছিল, পরিষ্কার বোঝা গিয়েছিল এই প্যাকেজ আসলে মস্ত বড় একটা ঢপের চপ। এই প্যাকেজ আর যাই হোক বামেদের বঞ্চনার অভিযোগকে ভোঁতা করে দিতে পারেনি, সেই অর্থে রাজীব গান্ধির চালটা শুরু থেকেই লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছিল।

এরপরে রাজীব গান্ধি যে কান্ডটি করলেন, তাঁর আগে অথবা পরে, কোনো প্রধানমন্ত্রী কোথাও তা করেননি, ভবিষ্যতে করবেন বলেও মনে হয় না। তিন দিন ধরে তিনি চরকি কাটলেন পশ্চিমবঙ্গের এ মাথা থেকে ও মাথা, সড়ক পথে। জর্ডনের রাজা সে সময় রাজীবকে একটি দামি জঙ্গা উপহার দিয়েছিলেন, খয়েরি রং, চিতার বেগে দৌড়য়। চালকের আসনে রাজীব নিজে, পাশে ঘোমটা টেনে সনিয়া গান্ধি, এক্কেবারে বার্বি ডল, রাস্তায় মানুষের ভিড় দেখলে অনেক কষ্টে দুটো হাত জড়ো করছেন এই পর্যন্ত। পিছনের সিটে প্রিয়রঞ্জন আর দশাসই চেহারার এক এস পি জি কমান্ডো। ভদ্রলোকের নামটা এখন আর মনে পড়ছে না, আমার সঙ্গে তাঁর বেশ সদ্ভাবই ছিল। রাজীব প্রধানমন্ত্রিত্ব খোয়ানোর পরেও তিনি দেহরক্ষীর দায়িত্ব পালন করছিলেন। শেষ পর্যন্ত ১৯৯১-এর ২১ মে শ্রীপেরুমপুদুরে আক্মঘাতী বোমায় রাজীবের সঙ্গে তাঁর দেহও ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়।

রাজীবের কনভয়ে সামনে থেকে চতুর্থ গাড়িটি বরাদ্দ হয়েছিল আমার জন্য। পুরোনো অ্যাম্বাস্যাডার, জঙ্গার গতির সঙ্গে পাল্লা দেবে কেমন করে? এইভাবে চললে অনেকটা পিছিয়ে পড়ব বুঝতে পেরে আমি সোজা দ্বিতীয় গাড়িটিতে উঠব বলে দৌড় লাগালাম, কোনো কারণে কনভয় তখন ক্ষণিকের জন্য থেমেছিল। পৌঁছে দেখি মনিশঙ্কর আইয়ার একা গাড়িতে বসে আছেন, সামনের সিটে ড্রাইভারের পাশে, পিছনের সিট বিলকুল ফাঁকা। পুরো যাত্রায় সেই গাড়িতেই আমি ঘাঁটি গেড়েছিলাম। তাঁর হাতে অপমানিত হতে তখনও ঢের দেরি। 

Powered by Froala Editor