Sahina Javed
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

‘আল্লাহকে বহুবার প্রশ্ন করেছি, কেন নিয়মগুলো সকলের জন্য আলাদা? কেন পাশের বাড়ির মহিলাদের উপর অত্যাচার হলে সেটা স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া হবে? উত্তর পাইনি।’ প্রহরকে বলছিলেন শাহিনা। আমরা বোঝার চেষ্টা করছিলাম তাঁর ভাবনার উত্তাপ। বোঝার চেষ্টা করছিলাম শাহিনার আকাশটাকে। সামান্য মেয়ে তো তিনি নন। তিনি প্রশ্ন করেন ধর্মকারার ঘেরাটোপকে, লড়াই চালান পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে, আবার উত্তাল হয়ে ওঠেন রাষ্ট্রের নানা ‘অন্যায়’-এর বিরুদ্ধেও। তিনি অন্যদেরও আকাশ খুঁজে নিতে শেখান। শাহিনা জাভেদের কথাগুলোও তাই সাধারণ নয়।

হয়তো অনেকেই চেনেন তাঁকে। অনেকে চেনেনও না। অবশ্য এসব চেনা বা না-চেনায় বিশেষ কিছু আসে যায় না তাঁর। নিজের কাজটুকুকে ঘিরেই তৈরি করেছেন একটা পৃথিবী। রোজ একটু একটু করে বড় হচ্ছে সেই পৃথিবীর পরিধিও। আর, সেই বিস্তৃতির লড়াইয়ের যোদ্ধা তিনি। সামনে একটা আকাশ রয়েছে, যেখানে হাত মেললে বাঁধাধরা নিয়মে টান পড়লেও বাঁচা যায় স্বাধীনভাবে। আর এই ভুলে যাওয়া কথাগুলো মনে করিয়ে দিতেই এগিয়ে আসেন কিছু মানুষ। তেমনই একজন শাহিনা। যিনি খাঁচার দরজা খুলতে সাহায্য করেছেন বহু মানুষের।

শাহিনা জাভেদ রাজাবাজারের এক লড়াকু মুখ। ছেলেবেলা থেকে দেখে আসা অবিচারের বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন তিনি। প্রশ্ন করেছেন সমাজের সমস্ত গোঁড়ামিকে। অথচ অদ্ভুত ব্যাপার, এই সবটাই করেছেন ধর্মকে সঙ্গে রেখে। পশ্চিমবঙ্গে তিনিই প্রথম মুসলিম মহিলা যিনি রেনবো প্রাইড ওয়াক-এ হেঁটেছেন, যৌনতার অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। আবার সিএএ, এনআরসি নিয়েও সরব হয়েছেন। সিএএ-কে তাঁর মনে হয় বিভাজনমূলক আইন। এই প্রতিবাদে সামিল হওয়ার সময় নিজের ধর্মীয় পরিচয়কে নিয়েই লড়াই চালাতে দ্বিধা নেই তাঁর। কারণ, এক্ষেত্রে তাঁর ধর্মীয় পরিচয়টিকেই আক্রমণ করা হচ্ছে, বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা চলছে। শাহিনাই এর আগে ধর্মের ভিতরে নারীর অধিকার নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন উঁচু গলায়। শাহিনার লড়াই আসলে অধিকারের লড়াই, মনুষ্যত্ব ফিরিয়ে আনার লড়াই।

ধর্মের সঙ্গে কি এই লড়াইয়ের বিরোধিতা রয়েছে কোথাও? উত্তরে প্রহরকে বলছিলেন তিনি – ‘ধর্ম বৈষম্যের কথা বলে না। নানা সময়ে নানা জায়গা থেকে নারী স্বর উঠে এসেছে। কিন্তু সেগুলোকে সামনে আসতে দেয়নি পুরুষতান্ত্রিক সমাজ। সেগুলো কাউকে জানতে দেয়নি তারা।’

নিজেও বিশ্বাস করেন, ধর্ম আসলে ধারণ করার কথাই বলে। মানুষই বিভিন্ন সময়ের ধর্মের দোহাই দিয়ে প্রতিকূলতার চেষ্টা করে। আর সেইসব প্রতিকূলতাকেই জয় করতে চান তিনি। ধর্মকে উপেক্ষা করে নয়, ধারণ করেই…

তাঁর লড়াইয়ের শুরুটাও কিন্তু কম আকর্ষণীয় নয়। ধর্মের থেকেও সেখানে প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছিল পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা। সমাজে মেয়েদের যে চোখে দেখা হয়, তার ব্যতিক্রম ছিল না শাহিনার পরিবারও। তিন ভাই আর এক বোন তাঁরা। সাদামাটা পরিবারে সমাজের আর পাঁচটা ঘরের মতোই তিনিও মুখোমুখি হয়েছেন বিভিন্ন বৈষম্যের। স্কুল থেকে ফেরার পর ভাইকে বেড়ে দেওয়া হয়েছে খাবার অথচ নিজেকে বেড়ে খেতে হয়েছে তাঁকে। এমনই কিছু ছোটো ছোটো ঘটনা প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছিল তাঁকে।

‘একটু বড় বয়সে যখন বুঝতে শুরু করি এগুলো বৈষম্য, তখন জিজ্ঞাসা করলে দিদা উত্তর দিতেন – এগুলো করতেই হয় মেয়েদের। এভাবেই চলে আসছে বহুদিন ধরে। আল্লাহ-ই এসব বানিয়েছেন।’

একটু থেমে শাহিনা বলেন, এরপর পাড়ায় লিঙ্গসাম্য নিয়ে একটা ওয়ার্কশপ হয়। সেখানে গিয়ে জানতে পারেন, সমাজের বর্তমান লিঙ্গবৈষম্য আল্লার তৈরি নয়, মানুষেরই তৈরি। নিজের স্বার্থেই এগুলো তৈরি করেছে মানুষ।

ভাঙতেও তো এগিয়ে আসতে হবে কাউকে! এভাবে কতদিন আর?

বছর বারো আগের কথা। শাহিনা তখন ক্লাস ইলেভেনের ছাত্রী। পাড়ার দশজন মেয়েকে নিয়ে পণব্যবস্থার বিরুদ্ধে শুরু করলেন পথনাটিকা। কেবল পণ দিতে হবে বলে একটি মেয়ের লেখাপড়ায় খরচা করা হয় না, তাকে কম খাইয়ে রাখা হয় যাতে শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে অসুবিধা না হয়। সমাজের এই অন্ধকার দিকগুলোই উঠে আসত তাঁদের নাটকে।

‘এই পথনাটিকার ফলে বহু প্রশ্নের সম্মুখীন যেমন হয়েছি, তেমনই সাপোর্টও পেয়েছি। কারণ এর আগে কেউ মেয়েদের হয়ে মুখ খোলেনি এই তল্লাটে। তবে এরপর থেকে এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটে, বিভিন্ন কেস আসতে থাকে আমাদের কাছে। বিয়ের পরে ভায়োলেন্সের কেস। আমরা আমাদের সামর্থ্য মতো কথা বলে, কাউন্সিলিং করে সেগুলো সমাধান করা শুরু করলাম।’

আমরা স্তব্ধ হয়ে শুনছিলাম তাঁর কথা। এমন একটা সমাজ, যেখানে আজও মেয়েদের অনেক পদক্ষেপই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়, বারবার, সেখানে এমন লড়াই কি ‘বিপ্লব’ নয়? ভাবছিলাম আমরা…

সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিকে বদলাতে চাওয়া শাহিনা তাঁর অঞ্চলের ৫ জন মেয়েকে নিয়ে শুরু করেছিলেন একটি ফুটবল দল। আজ সেই দলেই সদস্যা সংখ্যা প্রায় ৪৫। স্থানীয় আলেমের কন্যা তাঁর দলে ফুটবল প্র্যাকটিস করে। কিন্তু হঠাৎ ফুটবল কেন?

উত্তরে শাহিনা বললেন এক চরম সত্য। ফুটবল বললেই মাথায় আসে ছেলেদের কথা। কিন্তু মেয়েরা কেন পারবে না খেলতে? একটা নির্দিষ্ট বয়সের পর, মেয়েদের খেলার জায়গা প্রায় নেই বললেই চলে। শাহিনা সেই গণ্ডি ভেঙে দিতে চেয়েছিলেন। চেয়েছিলেন, নিজেদের সম্মান ছিনিয়ে নিক মেয়েরাও। বাকিটা ইতিহাস…

অথচ এঁরা সবাই সাধারণ পরিবারের। সেখানে মেয়েদের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলাই এক বিরাট লড়াই। নিজের বাড়িতেও এই বৈষম্য দেখেছেন ছোটো থেকেই। শাহিনাকে জিজ্ঞেস করা হল, তাঁর এই লড়াইয়ে কি পাশে পেয়েছেন পরিবারকে? জবাব দিতে গিয়ে, একই সঙ্গে আনন্দ ও ব্যথা ফুটে উঠল তাঁর মুখে। বললেন, মা’কে পাশে পেয়েছেন সবসময়। কিন্তু বাবা ও ভাইদের উৎসাহ পাননি তেমন। বরং বিরক্তিই ভেসে এসেছে। না, তাতে ভেঙে পড়েননি শাহিনা। বরং জেদ আরও উজ্জ্বল করেছিল তাঁকে। ভাঙতে হবে এই অচলায়তন। ভাঙতে হবেই…

সমাজের লাল চোখেরও শিকার হয়েছেন তিনি। মঞ্চে বক্তব্য দিতে উঠে মৌলবিদের বিরাগভাজন হয়েছেন। মৌলবিদের কাছে এখনও মেয়েদের গলার আওয়াজ শুনতে পাওয়াটাই পাপ। অথচ এতকিছুর পরেও ধর্মের প্রতি শাহিনার শ্রদ্ধাবোধ অটুট। তিনি পড়েছেন, বুঝেছেন এবং বিশ্বাস করেছেন। তাই অকপটে বলতে পারেন – ‘আমার ধর্ম কোথাও বৈষম্য শেখায়নি, মৌলবিরা যে ধর্মের কথা বলে সে ধর্ম আমার নয়।’

গতমাসে মার্কিন সরকারের রাষ্ট্রীয় অতিথি হয়ে শাহিনা পাড়ি দিয়েছিলেন আমেরিকায়। সেখানে বক্তব্য রেখেছেন তাঁর লড়াই নিয়ে। দেখেছেন, ওখানকার মসজিদে অনায়াসেই প্রবেশ করতে পারেন মহিলারা। গোঁড়ামি নেই কোনো।

তবে এই যাত্রা উপকারও করেছে। বিরোধিতা কমেছে খানিক। বিদেশ থেকে স্বীকৃতি পাওয়ায়, আত্মবিশ্বাস বেড়েছে তাঁর আশেপাশের মানুষজনেরও। লড়াই কি শুধুই শাহিনার? অন্যদের নয়?

কেন নয়! শাহিনার সাহসেই তো সাহসী হয়েছেন আরও কত মহিলা! ড্রাইভিং শিখছেন। জীবিকা হিসেবে গাড়ি চালানোকে বেছেও নিয়েছেন কয়েকজন। মেয়েদের গাড়ি চালানোকে মেনে নিতে পেরেছে সমাজ? শাহিনা হাসলেন।

‘সব জায়গায় সমস্যা। প্রত্যাখ্যান। তবু তার মধ্যেই লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। তারা চালাচ্ছেও। এমন একদিন আসবে, যেদিন দু’জন পুরুষ ড্রাইভারের পাশে দু’জন মহিলা ড্রাইভারও সমান সম্মান পাবে।’ শাহিনার চোখে ওটা কী? স্বপ্ন? না জেদ?

তবে বদলও ঘটেছে অনেক। ২০০৯ সালের ‘রোশনি ইউথ গ্রুপ’ থেকে আজকের দিন অব্দি এই যাত্রায় দেখেছেন অনেক উত্থানপতন। মানুষ ধীরে ধীরে বিশ্বাস করতে শিখেছে তাঁকে। এখন ১৫০টি শিশু ও তাদের পরিবার শাহিনাকে ভরসা করেন। জানেন, শাহিনা যেখানে আছেন, সেখানেই তাঁদের ‘মুক্তি’। মুক্তি শব্দটা যদিও আপেক্ষিক। কীসের থেকে মুক্তি? কেন মুক্তি? সত্যিই কি মুক্তি পাওয়া সম্ভব?

শাহিনা নিজে মুক্তি পেয়েছেন? না, পাননি। তিনি হয়তো চানও না। এই লড়াই, এই বদলের চেষ্টাতেই কাটিয়ে দিতে চান জীবনটা। তাই তো ব্যক্তিগত জীবনের ভাঙনের সময় আঁকড়ে ধরেন তাঁর ওপর নির্ভর করে থাকা অসহায় মহিলাদেরই। তাঁদের কথাই যোগায় লড়াইয়ের রসদ। তবে বৃহত্তর অর্থে দেখলে, যে মুক্তির জন্য তিনি লড়ছেন, নারীস্বাধীনতা, তাও কি অর্জন করেননি তিনি? আংশিক হলেও? নিজের এবং তাঁর ওপর নির্ভরশীল অসংখ্য মহিলার?

হ্যাঁ, তিনি পেরেছেন। আর পেরেছেন বলেই আজ লড়াইয়ের আরেক নাম শাহিনা জাভেদ। এ-সমাজ শাহিনাদের যোগ্য মর্যাদা দিতে পারছে কিনা, তা প্রশ্নসাপেক্ষ। কিন্তু সমাজকে শাহিনা যা দিয়ে যাচ্ছেন প্রতিদিন, তা কোননো রূপকথার চেয়ে কম নয়। শুধু আপনার রূপকথা থেকে একপেশে নায়ককে সরিয়ে এমন একজন নায়িকাকে বসিয়ে দেখুন। গল্পের সৌন্দর্য ন্যূনতম খর্ব হবে না, বরং এই সমাজ খানিক এগিয়ে যাবে। যাবেই। মিলিয়ে নেবেন…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here