গোটা দেশে, এমনকি কলকাতায় আজো প্রকাশ্যে বিকোচ্ছে অ্যাসিড, লড়াই থামেনি, বলছেন লক্ষ্মী আগরওয়াল

“দোকানে লাইসেন্স ছাড়া অ্যাসিড রাখা যাবে না—লড়াই ছিল এইটা নিয়ে। সুপ্রিম কোর্ট রায়ও দিলেন। কিন্তু তারপর? কলকাতায় তো এখনো লাইসেন্স ছাড়াই অ্যাসিড বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন দোকানে। তাহলে লড়াইটা শেষ হল কোথায়? ভবিষ্যতে কলকাতার কোনো মেয়েও যে অ্যাসিড-আক্রান্ত হবে না, তার নিশ্চয়তাই বা কে দিয়েছে?”

প্রহরকে বলছিলেন লক্ষ্মী। লক্ষ্মী আগরওয়াল। আপামর ভারতবাসী জানেন, লক্ষ্মীর জীবনকে ঘিরেই বোনা হয়েছে ‘ছপাক’ সিনেমার গল্প। সেই সিনেমার মুক্তি আজই। লক্ষ্মীর জীবনের কথা, লড়াইয়ের কথা এখন থেকে সবার মুখে মুখে ঘুরবে। বড়োপর্দায় দীপিকা পাড়ুকনকে দেখে হয়তো চোখ ভরে আসবে জলে, আবেগে শক্ত হয়ে উঠবে শরীর। লক্ষ্মীর বেঁচে থাকার গান চারিয়ে যাবে ভিতরে। কিন্তু, তারপর?

প্রহরের প্রতিনিধিদের বারবার এই প্রশ্নটাই ফিরিয়ে দিচ্ছিলেন লক্ষ্মী। আইনি লড়াইটা জিতলেও, আসল লড়াইটা যে এখনো জেতা যায়নি। নাহলে দোকানে আজো লাইসেন্স ছাড়া অ্যাসিড বিক্রি হচ্ছে কীভাবে? এ তো অবশ্য বোতলের আশ্রয়ে থাকা অ্যাসিড। আর যে ভয়ঙ্কর অ্যাসিড মগজে জমা হচ্ছে রোজ! তাকে আটকাবে কোন আইন?  

শিবম শর্মার লেখা একটা কবিতা পড়ে শোনাচ্ছিলেন লক্ষ্মী। সেখানেও ফিরে ফিরে আসছে একই কথা। ‘তেজাব হামারে দিমাগমে হ্যায়।’ পিতৃতন্ত্র রোজ জন্ম দিচ্ছে মন ও মগজের এই অ্যাসিড। যতক্ষণ না সেই অ্যাসিডকে সরানো যাচ্ছে, মুক্তি নেই। আমাদের আশেপাশে আরো কত লক্ষ্মী যে অপেক্ষা করে আছে ‘মুখপুড়ি’ হয়ে উঠবে বলে, কেউ জানি না।

https://www.youtube.com/watch?v=JR22lz3aPvM

কবিতা পাঠের শেষে তাই কি সামান্য দীর্ঘশ্বাস ফেললেন লক্ষ্মী? খানিক আগেই তাঁর সমস্ত উচ্চারণের ভিতর ডানা মেলছিল স্বপ্ন আর জেদ। কী যে সুন্দর লাগছিল তখন তাঁকে। প্রহরকে তিনি গল্প শোনাচ্ছিলেন। ‘ছপাক’ সিনেমার দৌলতে আজ থেকে সবাই লক্ষ্মীর গল্প জানবেন। কিন্তু চেনা গল্পের ভিতরেও তো লুকিয়ে থাকে আরও হাজারো গল্প। লক্ষ্মী সেইসব গল্পেরই হদিশ দিচ্ছিলেন আমাদের। এক আশ্চর্য পৃথিবীর গল্প। যে পৃথিবীতে মুখ পুড়ে গেলেও ‘মুখপুড়ি’-রা হার মানে না। যেখানে সৌন্দর্যের আর প্রেমের সীমানাটা বিরাট বড়ো। যেখানে অ্যাসিড জীবনটা পুড়িয়ে ছারখার করে দিতে পারে না। সৌন্দর্য পোড়াতে পারে না, কিছুতেই না...

লক্ষ্মী যখন হেসে ওঠেন, তাঁকে তাই অপূর্ব লাগে বারবার। তাঁর মেধা, তাঁর জীবনীশক্তি, তাঁর লড়াই, তাঁর মাতৃত্ব উজাড় হয়ে রয়েছে এই সৌন্দর্যে। এই লক্ষ্মীকে দেখেই তো প্রেমে পড়েছিলেন সহযোদ্ধা অলোক। তাঁদের একমাত্র মেয়ে পিহু যেন লক্ষ্মীরই প্রতিচ্ছবি। ঠিক যেন অ্যাসিড আক্রমণের আগেকার লক্ষ্মী। লক্ষ্মী পিহুকে দিচ্ছেন লড়াইয়েরও পাঠ। শেখাচ্ছেন, জীবন সহজ নয়, কিন্তু অগাধ সুন্দর। পিহুর সারল্যে তাই বড়ো সাবলীল এসে মিশেছে দৃঢ়তা। কার মেয়ে, দেখতে হবে তো! মেয়ের কথা উঠতেই ফের হেসে ওঠেন লক্ষ্মী।

কথায় কথায় উঠে আসে ক্যাফের প্রসঙ্গও। লক্ষ্মী আর অলোক আগ্রায় চালু করেছিলেন একটি ক্যাফে। ‘শিরোজ হ্যাংআউট’। ক্যাফেটি রয়েছে আজও। ক্যাফে চালান সেইসব ‘মুখপুড়ি’রা, যাঁদের চেহারা ক্ষতবিক্ষত হয়ে গিয়েছে অ্যাসিডের আক্রমণে। তবু মুখ লুকিয়ে থাকেননি তাঁরা। লড়াই চালাচ্ছেন, পরিচিতি তৈরি করছেন নিজেদের। ‘মুখপুড়ি’ পরিচয় নিয়ে আর হীনমন্যতা নেই কোনো।

কেনই বা থাকবে! লক্ষ্মীকেই তো তাঁরা দেখেছেন সামনে থেকে। দেখেছেন, কীভাবে পোড়া দগদগে ‘বীভৎস’ মুখ থেকে ওড়না সরিয়ে হাজারো চোখের দিকে চোখ তুলে তাকিয়েছেন লক্ষ্মী। সওয়াল করেছেন যত্রতত্র অ্যাসিড বিক্রি বন্ধের পক্ষে। বলেছেন, সমাজ থেকে উপড়ে ফেলা হোক প্রতিহিংসার মানসিকতাই। লক্ষ্মীকে দেখে নিজেরাও জুড়ে জুড়ে দাঁড়িয়েছেন সেইসব ‘মুখপুড়ি’-রা। তাঁদেরও যে পারতেই হবে। হারলে চলবে না।

কিন্তু, এই লড়াই কি সত্যিই জেতা সম্ভব? লক্ষ্মী হাসলেন। আবারও। ‘তেজাব হামারে দিমাগমে হ্যায়।’ পারি বা না পারি, চেষ্টা করতে ক্ষতি কী! সিনেমা করার অনুমতিও দিয়েছেন সে-কারণেই। আরো বেশি মানুষের কাছে পৌঁছোক এই লড়াইয়ের বার্তা, সচেতন হোক তাঁরাও। বুঝুক, অ্যাসিড-আক্রমণ থামানো আক্ষরিক নয়। অ্যাসিডের পর, কোনো মেয়ের মুখে ধারালো ব্লেডের আক্রমণ যেন না নেমে আসে। যেন ছিটকে এসে না লাগে লোহার চেন... এবং, এরই সঙ্গে দোকানে লাইসেন্স ছাড়া অ্যাসিডের বিক্রিও বন্ধ হোক। বদলের শুরুটা হোক এখান থেকেই।

এর আগেও লক্ষ্মী এসেছেন কলকাতায়। শহরের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ নেহাত ক্ষীণ নয়। প্রহরকে জানাচ্ছিলেন, এখানে এখনো ঢালাও বিক্রি হয় অ্যাসিড। অথচ, এখন বাথরুম পরিষ্কার করতে গেলে আর অ্যাসিড লাগে না। তবুও বিকোচ্ছে। সব স্তরের মানুষ যদি সচেতন না হন, সত্যিই কিচ্ছু বদলাবে না। কিচ্ছুটি না। লক্ষ্মী তবু হাল ছাড়েননি। #stopsaleacid ক্যাম্পেইনও জারি আছে। যতক্ষণ না ভারতের শেষতম মানুষটি বুঝছে, তাঁর লড়াই চলবে।

আজ থেকে কলকাতা ‘ছপাক’ দেখবে। শহর, শহরতলি, মফস্‌সল। দেখতে দেখতে শিহরিত হবে। চোখে জল আসবে। সময়ের পালা ফুরোলে সব আবেগের তল্পি-তল্পা গুটিয়ে হল থেকে চলে যাবে সিনেমা। কিন্তু তারপর? লক্ষ্মী ফের প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন আমাদের দিকে। আমরাও কি এই লড়াইতে যুক্ত হব? আমরা কি বেরিয়ে দোকানে-দোকানে গিয়ে জিজ্ঞেস করব, এখানে অ্যাসিড রাখা হচ্ছে কিনা? লাইসেন্স আছে? তারপর? আমরা কি এর পরের ধাপটা নিয়েও ভাবব না? দোকানের অ্যাসিড নয়, মনের অ্যাসিড!

ছবি কৃতজ্ঞতা: লক্ষ্মী আগরওয়ালের ফেসবুক পেজ ও 'প্রান্তকথা'

More From Author See More

Latest News See More

avcılar escortbahçeşehir escortdeneme bonusu veren sitelerbahis siteleri