অ্যান্টিক মূর্তির টোপ দিয়ে স্মাগলারকে অপরহণ, চম্বলের ঘটনায় কেঁপে উঠেছিল দিল্লিও

দুর্ধর্ষ দুশমন - ২৬
আগের পর্বে

মোহর সিং পেশায় ছিলেন একজন কৃষক। তবে তার ছোট্ট একফালি জমিও চলে যায় অন্য পরিবারের দখলে। মোহর সিংকেও মারধর করে তারা। থানায় অভিযোগ লেখাতে গেলে, পুলিশ মামলা করে মোহরের নামেই। আর তা থেকেই শুরু হয় এক রক্তক্ষয়ী শত্রুতার। আইন ছেড়ে বেহড়ের পথ বেছে নেয় চম্বলের ডাকাত সম্রাট। কোনো গ্যাং-এ জায়গা না পাওয়া মোহর নিজেই তৈরি করে নেয় গোটা একটা দল। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে তার সদস্য সংখ্যা, আয়তন। মানসিং, রূপা, গব্বর সিং-এর পর চম্বলে পুলিশের অন্যতম আতঙ্ক হয়ে উঠেছিল মোহর। তার মাথার দাম দাঁড়িয়েছিল ২ লক্ষ টাকা। দায়ের হয়েছিল ৩১৫টি কেস। তারপর...

মোহর সিং কিছু কঠোর নিয়মও তৈরি করেছিলেন দলের জন্য। তার মধ্যে প্রধান ছিল দলে কোনো মহিলা ডাকাতকে শামিল করা যাবে না। সেই সঙ্গে দলকে কড়া হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছিল যে গ্যাং-এর কেউ যেন কোনো মেয়ে বা মহিলার দিকে চোখ তুলে না দেখে। যদি এর অন্যথা হয় তাহলে তাকে মোহর সিং স্বয়ং শাস্তি দেবেন। আর সেই শাস্তি মৃত্যু। আজো পুরোনো পুলিশ অফিসারদের মোহরের এই হুঁশিয়ারি স্মরণে রয়েছে। এই একটা ব্যাপারে আজো পুলিশ আধিকারিকরা মোহরের প্রশংসা করেন। এই নীতিকে প্রায় পঞ্চাশ বছর পরে আজো মোহর সিং মনে রেখেছেন। আজো মোহর গর্ব করে বলেন, ‘মেরে গ্যাং-কে উপর কভিভি কিসিভি গাঁওকে বহু বেটিকো ছেড়নে ইয়া পড়েশান করনে কা কোই মামলা কভি নেহি দর্জ হুয়া থা’। ১৯৬০-৬২ সালের মধ্যে মোহর সিং চম্বলের ডাকাত সর্দারদের মধ্যে প্রধান নাম হয়ে উঠেছিলেন। প্রায় প্রতিদিনই পুলিশের সঙ্গে তার এনকাউন্টার স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু মোহরের এসব নিয়ে কোনো পরোয়াই ছিল না। কারণ টাকা পয়সা হাতে আসার সঙ্গে সঙ্গেই মোহর সিং পুলিশের চেয়েও উন্নত হাতিয়ার সেই সময় হাসিল করে নিয়েছিলেন। সেইসঙ্গে মোহর সিং নিজের দলকে বাঁচাতে নতুন নতুন উপায় খোঁজা শুরু করে দিয়েছিলেন। সেই সময় আধুনিক হাতিয়ার আর মোহরের পুলিশের সঙ্গে সোজাসুজি টক্কর নেওয়ার দুঃসাহস মোহরকে চম্বলের মুকুটহীন সম্রাটে পরিণত করেছিল।

বৃদ্ধ হয়েছেন বয়সে কিন্তু মানসিকভাবে এখনও সেই দুর্দান্তপনা রয়েই গেছে মোহর সিং এর

 

এর মধ্যেই মোহর চম্বলে অন্যান্য দলের সঙ্গে মিলে পুলিশকে ফাঁকি দেওয়া আর ডাকাতি করার এক নতুন ট্রেন্ড চালু করে দিয়েছিলেন। মোহর সিং, মাধো সিং, সরু সিং, রাম লক্ষ্মণ, মাস্টার আর দেবীলালের দলের সঙ্গে মিলে ডাকাতি করতে শুরু করেন। পুলিশের দল ১০০-২০০ সশস্ত্র ডাকাতদের মুখোমুখি হওয়া থেকে বাঁচার চেষ্টা করত। মোহর সিং-এর মাথা পুলিশের কাছে ভীষণ দামি হয়ে উঠেছিল। এক-এক গ্রামে ডাকাতি করে আর হঠাৎ করেই ম্যাজিকের মতো গায়েব হয়ে যায় মোহরের দল। পুলিশের মুখবীর তাদের কোনোরকম মুভমেন্টের খবর হাসিল করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হতে থাকে। একের পর এক বড়ো ডাকাতি। পুলিশ মোহরকে থামাতে চাইছিল আর মোহর জলের স্রোতের মতো বয়ে চলেছিল পুলিশের হাতের বাইরে। পুলিশ মোহরের খোঁজে একের পর এক গ্রামে রেইড শুরু করে, আর প্রতিবারই পুলিশকে খালি হাতে ফিরতে হয়। চম্বলে ডাকাতরা এক ধরনের রাজত্ব কায়েম করে ফেলেছিল। অন্যদিকে পুলিশ এক-এক করে বড়ো দলগুলোকে শেষ করে চলেছিল।

১৯৬৫-তে ঘটল এমন এক ঘটনা, যা এর আগে কখনো দেখেনি চম্বল। এমন দুঃসাহস চম্বলে আগে কখনো কোনো দল করে দেখাতে পারেনি। মোহরের এক সঙ্গী নাথু সিং (এই নাথু সিং-এর সঙ্গেও পরে আমার সাক্ষাৎ হয়। তার মুখেও শুনেছিলাম এই ঘটনার কথা) একটি পরিকল্পনা করেন। মোহরেরও মনে ধরে এই পরিকল্পনা। চম্বল এলাকায় সেইসময় কেউই এটা ভাবতে পারেনি যে, দিল্লির কোনো লোককে পকড় করা যেতে পারে। পরের কাহিনি শোনা যাক মোহরের বয়ানেই।

আরও পড়ুন
চম্বলের ‘রাজা’ ডাকু মোহর সিং, তিন রাজ্যের এক-নম্বর শত্রু

ডাকাতি ছেড়েছেন বহুযুগ, কিন্তু নিজের সর্বক্ষণের বন্দুকটি এখনও ছাড়তে পারেননি মোহর

 

‘দিল্লির পুরোনো মূর্তির স্মাগলার শর্মার (আজ আর নাম মনে নেই) ব্যাপারে আমার লোকেদের কাছে এই তথ্য ছিল যে, সে মূর্তি কেনার জন্য যে কোনো জায়গায় যেতে পারে। ব্যস এখান থেকে পুরো প্ল্যান তৈরি হয়ে যায়। দিল্লি থেকে দলের একজনের মাধ্যমে শর্মাকে ফোন করে বলা হয় যে, কিছু অ্যান্টিক মূর্তি চুরি করা হয়েছে, আর তা রয়েছে চম্বলের এক ব্যক্তির কাছে। এই খবরে রাজি হয়ে যায় দিল্লির সেই স্মাগলার। প্রথমে শর্মা নিজের একজন লোককে পাঠায় চম্বলে। সেই ব্যক্তিকে আমরা বন্দি করে নিই। তার মাধ্যমে শর্মাকে খবর পাঠাই, মাল একদম ঠিকঠাক। শর্মাসাহেব প্লেনে করে গোয়ালিয়ারে পৌঁছোন। সেখানে একটি গাড়িতে করে মূর্তি দেখানোর বাহানায় আমার লোকেরা চম্বলের ডাঙে নিয়ে আসে তাকে। জঙ্গলে নিজেকে আমাদের দলের মধ্যে ঘেরাও হয়ে যেতে দেখে শর্মা বুঝে যায়, সে ডাকাতদের চক্করে ফেঁসে গিয়েছে। সেই সময় শর্মার সঙ্গে দিল্লির তাবড় তাবড় নেতা মন্ত্রীদের যোগাযোগ ছিল। ফলে শর্মা অপহরণ হতেই নড়েচড়ে বসে দিল্লি প্রশাসন। দিল্লি থেকে ভোপালে খবর যায়। কেন্দ্র থেকেও মুরেনা পুলিশের কাছে নির্দেশ যায় দ্রুত অ্যাকশন নেওয়ার। কিন্তু পুলিশ শর্মার ছায়াকেও ছুঁতে পারেনি।  শেষপর্যন্ত শর্মার পরিবারকে টাকা দিয়ে তাকে ছাড়িয়ে নিয়ে যেতে হয়। চম্বলে এই পরিমাণ টাকা দিয়ে এর আগে কোনো অপহৃতকে ছাড়ানো হয়নি।’ থামাই মোহরকে। কত টাকা পেয়েছিলেন? পেল্লাই গোঁফে তা দিয়ে হাসতে থাকেন বৃদ্ধ মোহর। তারপর খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে আমার দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘আন্দাজা লাগাইয়ে’। আমি আর কি আন্দাজা লাগাব, দু-তিন লাখ। মাথা নাড়েন মোহর। শেষে হাল ছেড়ে দিই। হাসতে হাসতে অশীতিপর মোহর বলেন, ‘পুলিশ রিকার্ডমে লিখ্যা হ্যায় পাঁচ লাখ। চম্বলকে ইতিহাসমে পকড়কে লিয়ে ইয়ে থা সবসে বড় রকম। পর আভি মেরি উমর হো চুকি হ্যায়। মেরা এক পাও কবর মে হ্যায়। আজ সচ বোলনা চাহাতা হুঁ। আপ মেরে নাতিনকে উমরকে হো। ইসিলিয়ে আপকো আজ সচ বাতিয়াতা হুঁ। আসলমে ইয়ে রকম থি ছাব্বিশ লাখ কি। উসকি ফ্যামিলি (শর্মার) আগর উস সময় সচ বাতিয়াতি, তো খুদই ঝামেলে মে পড় যাতি মিডিয়ামে। ইসলিয়ে রকম কম বাতাই শালোনে’। টাকার অঙ্ক শুনে চারপাই থেকে পড়ে যাচ্ছিলাম। ১৯৬৫ সালে অপহরণ করে ছাব্বিশ লাখ টাকা! হাসতে থাকেন মোহর।

আরও পড়ুন
‘এক ঘন্টে সে দেখ রাহা হুঁ, মতলব ক্যা তুমহারা?’ গর্জে উঠলেন চম্বল-কাঁপানো ডাকাত মোহর সিং

ইন্টারভিউতে জানিয়েছিলেন মোহর জীবনের সেরা তিনটি জিনিস গোঁফ, বন্দুক আর ট্র্যাক্টর তিনি পেয়ে গিয়েছিলেন, আর কোনো আফসোস নেই

 

চম্বলে মোহর সিং পুলিশের খাতায় এমন এক নাম হয়ে ওঠে যাকে পুলিশবিভাগ জলজ্যান্ত ভূত বলে ডাকত। যে কোনো বড়ো ঘটনার পেছনেই পুলিশ মোহর সিং-এর গন্ধ খুঁজছিল। এক প্রাক্তন পুলিশ আধিকারিকের কথায়, চম্বলে পুলিশ আর মোহরের এই লুকোচুরি এক মজাদার গল্প হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আর তখনই এক নতুন মোড় আসে। চম্বলে রাজত্ব করতে থাকা মোহর ততটাও লেখাপড়া জানা ছিলেন না, কিন্তু এটা জানতেন যে গুলির শেষ গুলিতেই হয়। আঠাশ বছর বয়সে কুখ্যাত হয়ে ওঠা মোহর নিজের আশেপাশে মৃত্যুকে দেখতে শুরু করেন। আর মৃত্যুর ছায়াকে দূর করার অবলম্বন খুঁজে পেয়েই হাতছাড়া করেননি মোহর। কালকের ডাকাত মোহর, আজকের সমাজসেবী নেতা মোহর সিং-এর চলার পথে অনেক চড়াই উতরাই দেখেছেন। চম্বলে মোহর সিং আর মাধো সিং-এর বন্ধুত্বের উদাহরণ দেওয়া হয়। মোহর আর মাধো পুলিশ রেকর্ডেও বন্ধু হিসেবে নথিভুক্ত ছিল। অর্থাৎ এনিমি নম্বর ১ আর এনিমি নম্বর ২। দুজনের গ্যাং চম্বলের সবচেয়ে বড়ো গ্যাং ছিল। একদিকে এই দুই ডাকাতের দলের আতঙ্কে চম্বলের লোক যেমন কেঁপে উঠত, অন্যদিকে তারা সরকারের ভিতও নাড়িয়ে দিয়েছিলেন। রাজস্থান যেতে পারিনি সময়াভাবে কিন্তু উত্তরপ্রদেশ আর মধ্যপ্রদেশের যে ক-টা পুলিশ থানায় আমি গেছি, সেখানে মোহরের দলের অপরাধের খতিয়ান গিনেসবুকে ওঠার মতো। একটা তালিকা দিলেই বোঝা যাবে।
১৯৬৫-তে ১৫১টি ডাকাতি, ৪৬টি হত্যা, ১১৪টি অপহরণ
১৯৬৬-তে ১০২টি ডাকাতি, ৪০টি হত্যা, ১২৫টি অপহরণ
১৯৬-তে ৯০টি ডাকাতি, ৬৩টি হত্যা, ১০৫টি অপহরণ
১৯৬৯-তে  হত্যার সংখ্যা ৮০ আর অপহরণের সংখ্যা প্রায় ২০০

আরও পড়ুন
‘চম্বলের থেকেও অনেক বড়ো বড়ো ডাকাত আছে রাজনীতিতেই’ : বাগী মোহর সিং

Powered by Froala Editor

Latest News See More