একুশে ফেব্রুয়ারির সত্যজিৎ

সেটা ছিল একুশে ফেব্রুয়ারির বিশ বছর। সাল ১৯৭২। ১৯৭২-এর একুশে ফেব্রুয়ারি ঢাকার পল্টন ময়দানে সত্যজিৎ রায় বক্তৃতা দিলেন একুশে ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠানে। আমন্ত্রণ জানিয়েছিল, বাংলাদেশের ছাত্র লিগ। তখনো আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষ্যে একুশে ফেব্রুয়ারির ঘোষণা হতে আরো বছর ত্রিশেক বাকি। সত্যজিতের সেই অভিভাষণ ফিরে পড়া দরকার। কারণ, এক অর্থে মাতৃভাষাতে আজীবন কাজ করলেও, সরাসরি মাতৃভাষার পক্ষ অবলম্বন করে সেভাবে কথা বলেননি তিনি। ফলত, এই অভিভাষণ সেই এক উপলক্ষ্য, যেখানে বাংলা আর বাংলাভাষা নিয়ে সত্যজিতের কথা উচ্চারিত হল। সেদিক থেকে ওই অভিভাষণ পড়াটা দরকার। 

নাতিদীর্ঘ সেই প্রবন্ধ বা অভিভাষণের শুরুতেই তিনি স্পষ্ট করেছিলেন, পশ্চিমবঙ্গের মানুষের বাংলাভাষার প্রতি ভালোবাসা আর তখন সদ্যোজাত বাংলাদেশের মানুষের বাংলাভাষার প্রতি যে ভালোবাসা, তার প্রকৃতি স্বতন্ত্র। তখন থেকেই তিনি লক্ষ করেছিলেন, "পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতির মধ্যে আরও পাঁচ রকম সংস্কৃতির প্রভাব এসে পড়ে সেটাকে একটা পাঁচমিশালি ভাব এনে দিয়েছে। ইংরেজির প্রভাব আমরা এখনও পশ্চিমবঙ্গে সম্পূর্ণ কাটিয়ে উঠতে পারিনি।" 

পশ্চিমবঙ্গের বাংলা চর্চা আর ওপার বাংলার বাংলা চর্চার মাঝখানে আছে ওই বৈদেশিক ও অন্যান্য প্রাদেশিক প্রভাবের তারতম্য। যথার্থ একটি দিগনির্দেশ করেছিলেন সত্যজিৎ। জানিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গের মানুষের বাংলাভাষার সঙ্গে যোগাযোগের মধ্যে অবশ্যই মনে রাখতে হবে, "পশ্চিমবঙ্গ হল ভারতবর্ষের একটা প্রাদেশিক অংশমাত্র।" দুটি বাক্যে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের কথা বললেন। প্রথমত, ঔপনিবেশিক আবহের উত্তরাধিকার; দ্বিতীয়ত, শুধু বৈদেশিক নয়, দেশীয় বিভিন্ন ভাষা সংস্কৃতির প্রভাব; তৃতীয়ত, একটি বহুভাষিক রাষ্ট্রের অন্যতম ভাষা হওয়ার দিক। এই পরিস্থিতিগত আত্মপরিচয়ের সংকট পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির ভিতর জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতেও বর্তমান। 

১৯৭২-এ বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর বাসভবনে সত্যজিৎ। পাশে আছেন সংগীতশিল্পী শ্যামল মিত্র।

 

আরও পড়ুন
স্পটলাইটের আলো-কাড়ার কাহিনি

তবে তা থাকা সত্ত্বেও, পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির সঙ্গে বাংলাভাষার একটা অন্যতর গভীর যোগাযোগ আছে। সেখানেই তিনি নিজের কথা বলতে গিয়ে যে ভাষায় লিখেছেন সেই কথা, তার ভাষা বেশ অন্য রকম। কারণ, সাধারণভাবে সত্যজিতের গদ্যভাষা বেশ সংযত আর আবেগের আতিশয্যহীন। অথচ, এখানে সত্যজিৎ লিখলেন, বিভিন্ন সময়ে তাঁর কাছে অন্য ভাষা-মাধ্যমে ছবি তৈরি করার প্রস্তাব এলেও, তিনি সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেননি। আর সেই গ্রহণ না-করার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সত্যজিৎ লিখলেন: "আমি জানি যে, আমার রক্তে যে ভাষা বইছে, সে ভাষা হল বাংলা ভাষা, আমি জানি যে সেই ভাষাকে বাদ দিয়ে অন্য ভাষায় কিছু করতে গেলে আমার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাবে, আমি কূলকিনারা পাব না, শিল্পী হিসেবে আমি মনের জোর হারাব।" নিজস্ব শিল্পীসত্তার সঙ্গে ওতপ্রোত তাঁর ভাষাপ্রেম, বললেন তিনি। 

আরও পড়ুন
একটি দৃশ্য কয়েকটি সংলাপ

আরও পড়ুন
শতবার্ষিকী স্মরণে : প্রোফেসর এইচ- বি- বি- ২

তিনিও বললেন, নিজের দেশের বাড়ির কথা। তাঁর সেই দেশের বাড়ির ধারণা, স্বাধীনতা- উত্তর দেশভাগের যন্ত্রণাময় ইতিহাস থেকে হয়ত তৈরি হচ্ছে না, কিন্তু সেটাও কিন্তু দেশের বাড়ির কথাই। তাই ভাষার সঙ্গে নিজের যোগাযোগ সন্ধান করতে গিয়ে সত্যজিৎ মনে করিয়ে দিলেন, তিনি সেভাবে কখনো এই দেশে আসেননি। অবশ্যই শুনেছেন, দেশের বাড়ির কথা। ঠাকুরমার কাছে ছেলেবেলায় শুনেছেন, ময়মনসিংহের কথা। সেই শ্রুতির জগতের সঙ্গে তাঁর শৈশবের পড়ার জগৎ গড়ে তুলেছে, উত্তর কলকাতায় জন্মানো আর দক্ষিণ কলকাতায় বড়ো-হয়ে-ওঠা কিশোর সত্যজিতের দেশের প্রতি টান। তিনি জানালেন, ঠাকুরদা উপেন্দ্রকিশোরের লেখা "পূর্ববঙ্গের কাহিনি টুনটুনির বই"-এর কথা। লক্ষণীয়, 'টুনটুনির বই'-কে সত্যজিৎ চিহ্নিত করছেন "পূর্ববঙ্গের কাহিনি" বলে। মনে পড়বে, স্বয়ং উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরি 'টুনটুনির বই'-এ 'গ্রন্থকারের নিবেদন অংশে ১৯১০ সালে লিখেছিলেন, "সন্ধ্যার সময় শিশুরা যখন আহার না করিয়াই ঘুমাইয়া পড়িতে চায়, তখন পূর্ববঙ্গের কোনো কোনো অঞ্চলের স্নেহরূপিনী মহিলাগণ এই গল্পগুলি বলিয়া তাহাদিগকে জাগাইয়া রাখেন।" এই কাহিনি-উৎস মনে পড়িয়ে দিলেন সত্যজিৎ।এই নিজস্ব লোককথার সঙ্গেই তিনি উপেন্দ্রকিশোরের লেখা গানের সম্পর্কে লিখলেন, সেখানে "আমি পূর্ববঙ্গের লোকসংগীতের আমেজ পেয়েছি"। গান আর রূপকথার ভিতর থেকে গড়ে উঠছে তাঁর দেশের প্রতি টান। নিজেদের দেশের বাড়ি ময়মনসিংহ না-এলেও তাঁর অভিভাষণ সাক্ষ্য যে, ১৯২৬-২৭ সালে, তাঁর যখন "পাঁচ কি ছয় বছর বয়স" তখন তিনি একবার ঢাকাতে এসেছিলেন। তাঁর এই শৈশবের ঢাকার ভ্রমণের কথা, ওয়ারি অঞ্চলের র‌্যাঙ্কিন স্ট্রিটে, তাঁর মামাবাড়িতে আসার কথা 'যখন ছোট ছিলাম'-এ নেই। 

আরও পড়ুন
শতবার্ষিক স্মরণে প্রোফেসর এইচ বি বি- পর্ব ১

টুনটুনির বই-এর প্রচ্ছদ। শিল্পী: উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরি

 

তাঁর এই জীবন- তথ্যের জন্যেও তো এই অভিভাষণটি দরকারি। ঔপনিবেশিক কালপর্বের সেই ভ্রমণে, শিশু সত্যজিৎ পদ্মার ওপরে স্টিমারে চড়ে ঘুরে বেরিয়েছিলেন, ভোরবেলা ছেলের ঘুম ভাঙিয়ে মা সুপ্রভা দেখিয়েছিলেন সূর্যোদয়, দেখিয়েছিলেন পদ্মা আর মেঘনার মিলনস্থল। 

সেই সময়ের সেই সুখস্মৃতি থেকে সত্যজিতের মনে হত, ময়মনসিংহের বাড়ি যাওয়ার কথা, লিখছেন, "মনে হয়েছে যে একবার নিজের দেশটা দেখে আসতে পারলে ভালো হত, কিন্তু সে আশা, বিশেষত দেশ বিভাগের পর ক্রমেই দুরাশায় পরিণত হতে চলেছিল।" সত্যজিতের কলমে এই ধরনের দেশের প্রতি, দেশের মাটির দিকে টানের কথা সচরাচর আর শোনা যায়নি। সেদিক থেকেও এই অভিভাষণ গুরুত্বপূর্ণ। 

এই আবেগঘন অভিভাষণ শেষ হয়েছিল, বাংলাদেশের মানুষের কাছ থেকে সেই শহিদ দিবসের অনুষ্ঠানে তাঁকে সম্মাননা-জ্ঞাপনের বিষয়ে তাঁর অনুভূতির কথায়। এই উপস্থাপনার প্রথম অংশে যে অনুভূতি থেকে স্ব-দেশের প্রতি আকর্ষণের কথা বলেছিলেন, সেই পটভূমি থেকে বোঝা যায়, শেষের ওই বাক্য কোনো আনুষ্ঠানিক উচ্চারণ নয়, সেটাও তাঁর আন্তরিক সত্য-অনুভূতি। বললেন, "আজকের যে সম্মান, সে সম্মানের কাছে আগের সমস্ত সম্মান হার মেনে যায়, এর চেয়ে বড়ো সম্মান আমি আর কখনো পাইনি আর আমার মনে হয় না, আমি আর কখনো পাব।" শেষ করলেন অভিভাষণ, "জয় বাংলা" বলেই। সত্যজিতের এই স্বল্প-পরিচিত অভিভাষণটি সত্যজিতের অন্য সমস্ত অভিভাষণের থেকে--- কি ভাষার দিক থেকে, কি বলার ধরনে--- স্বতন্ত্র। তাই নয় কি?

Powered by Froala Editor