দাবিদার ছিলেন মহাত্মা গান্ধী, তাঁর মৃত্যুতে দেওয়া হল না নোবেল শান্তি পুরস্কারই

এ-বছর মহাত্মা গান্ধীর সার্ধশতবর্ষ পূরণের মাসেই ভারতের আরেকটি নোবেল প্রাপ্তি। অনিবার্য অভিনন্দন, গর্ববোধ, পাশপাশি কুৎসা রটনা, কাদা ছোঁড়াছুঁড়ির তো চলছেই। কিন্তু এর সূত্র ধরে আলোচনা চলতে পারে ইতিহাসের প্রায়-অনালোচিত একটি অধ্যায় নিয়েও। রাজনীতির অঙ্গনে অহিংসার প্রবর্তন ঘটাতে যিনি অনেকটাই সফল হয়েছিলেন, তাঁর ভাগ্যে কেন একটিও নোবেল শান্তি পুরস্কার জুটল না। নোবেল শান্তি পুরস্কারের ঘটনাপঞ্জি যিনি লিপিবদ্ধ করেছিলেন সেই গ্রে-র মতে, এই প্রশ্ন আরও বেশি প্রকট হয়ে ওঠে, যখন দেখা যায় গান্ধীজিরই আদর্শ অনুসরণ করে দুজন মানুষ পরবর্তীকালে নোবেল পেয়েছেন। এঁরা হলেন মার্কিন জন-অধিকার আন্দোলনের প্রবক্তা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র, যিনি স্বীকার করতেন মহাত্মা গান্ধীর জীবনদর্শনই তাঁর আদর্শ। অন্যজন হলেন দক্ষিণ আফ্রিকার শিক্ষক ও রাজনীতিবিদ অ্যালবার্ট লুথুলি, বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যিনি গান্ধীর অহিংসা সত্যাগ্রহের সফল প্রয়োগ ঘটিয়েছিলেন।

আরও পড়ুন
আনতে যেতে হয়নি, নোবেলই এসেছিল রবীন্দ্রনাথের কাছে

১৯৩৪ সালে শিকাগোর ‘দ্য ক্রিশ্চিয়ান সেঞ্চুরি’ পত্রিকা তাদের সম্পাদকীয় কলামে লিখেছিল -“Why not award the Nobel peace prize to Gandhi? It would be no personal favor to him and he probably does not want it. The honor would not greatly impress him and he would not know what to do with so much money except give it away. These are all high qualifications for such a prize. The Nobel Committee could find no worthy recipient for the award in 1933. ....It is asserted that the founder’s intention was to encourage bold dreamers and prophetic spirits whose ideas are too far ahead of their time to win attention without some such adventitious aid, rather than to reward practical politicians who merely negotiated another treaty or took another mile of trench in the long campaign against bloodshed.”

যাঁকে পুরস্কার দেওয়া নিয়ে এত তদ্বির, সেই মোহনদাস গান্ধী তখন বিহারে। সেখানে সদ্য ভূমিকম্পে বহু গ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত। বাদ পড়েনি পাটনাও। এই ভূমিকম্পকে কেন্দ্র করে তাঁর বর্ণবাদিতা-পাপের শাস্তি একাকার করা বহু-বিতর্কিত মন্তব্যটি স্বয়ং রবীন্দ্রনাথকেও ক্ষুব্ধ করেছিল। কিন্তু ওই সফর চলাকালীনই তাঁর অহিংস সত্যাগ্রহকে প্রথম আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেওয়ার দাবী উঠেছিল। সফরে তাঁর সঙ্গী ছিলেন বাবু রাজেন্দ্র প্রসাদ ও ইংরেজ শ্রমিক কল্যাণ সংস্কারক আগাথা হ্যারিসন। তাঁর সাপ্তাহিক মৌনব্রত পালনের দিন আগাথা যখন তাঁকে প্রকাশিত লেখাটি পড়ান, তিনি পুরোটা পড়ে হাসিমুখে কেবল একটি মন্তব্যই করেছিলেন আগাথার উদ্দেশ্যে - ‘Do you know of a dreamer who won attention by ‘adventitious aid’?’

আরও পড়ুন
নোবেলের কাছাকাছি গিয়েও ফিরতে হয়েছিল যে ১৪ জন বাঙালিকে

১৯৩০ সালে তাঁর ডাণ্ডি যাত্রা আন্তর্জাতিক স্তরে যেরকম সাড়া ফেলেছিল, তারপর থেকেই দোর্দণ্ডপ্রতাপ ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে তাঁর এই অভিনব পন্থা সম্পর্কে আরও বেশি করে কৌতূহলী হয়ে ওঠে বিশ্ববাসী। ১৯৩৪ সালে রিচার্ড গ্রেগের লেখা ‘দ্য পাওয়ার অফ নন ভায়োলেন্স’ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তুমুল জনপ্রিয় হয়েছিল। যদিও সেবছর তিনি মনোনয়ন পাননি, কিন্তু তিনবছর পরেই ১৯৩৭ সালে তাঁকে মনোনীত করেন নরওয়ের লেবার পার্টি সাংসদ ওলে কল্বজর্ন্সেন। কিন্তু শোনা যায়, ব্রিটিশ সরকারের চাপে পড়ে সেবার তাঁকে পুরস্কৃত করা থেকে পিছিয়ে আসে কমিটি। যদিও এই তথ্য প্রমাণসাপেক্ষ, কারণ সেইসময়ে গান্ধীজি প্রত্যক্ষ রাজনীতি থেকে অনেকটাই সরে এসেছেন এবং তখন অনেক বেশি তিনি হরিজন-কল্যাণে ব্রতী। বরং তাঁকে নির্বাচিত না করার পেছনে কারণ হিসাবে উঠে আসে কমিটির উপদেষ্টা জেকব ওয়ার্ম-মুলারের মতামত। জেকবের মত ছিল, গান্ধীজি হয়ত অসাধারণ একজন ব্যক্তিত্ব, সৎ, ন্যায়পরায়ণ, ভারতের মানুষ তাঁকে অপরিসীম শ্রদ্ধা করে, কিন্তু তাঁর বেশ কিছু নীতি নির্ধারণের সঠিক কোনও ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব নয়। তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামী, অথচ, একই সময়ে তিনি একজন একনায়ক, তিনি আদর্শবাদী আবার জাতীয়তাবাদী। তিনি কখনও ঈশ্বর, আবার কখনও একজন সাধারণ রাজনীতিকের স্তরে নেমে আসেন।

পরবর্তী দু’বছরেও তিনি পরপর মনোনয়ন পেলেও তাঁর নাম শেষ বাছাই তালিকায় পৌঁছোয়নি। আবার তিনি মনোনয়ন পেয়ে শেষ বাছাই তালিকায় পৌঁছোলেন প্রথম মনোনয়ন পাওয়ার দশ বছর পরে। সে-বছরেই স্বাধীনতা পেল ভারত। ১৯৪৬-৪৭-এর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-বিধ্বস্ত নোয়াখালি, কলকাতা, বিহার, দিল্লির বিভিন্ন অঞ্চলে তাঁর পরিভ্রমণ, সর্বোপরি ঐতিহাসিক অনশনের মাধ্যমে বেশ কিছু জায়গায় তিনি যে শান্তি ফিরিয়ে আনতে পেরেছিলেন, সেই কাজই তাঁর এবারের মনোনয়নটিকে জোরদার করেছিল। কিন্তু চূড়ান্ত নির্বাচনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াল কাশ্মীর নিয়ে দুই সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রের মধ্যে সংঘটিত যুদ্ধ। কাশ্মীরে সেনাবাহিনীর সাহায্য নেওয়ার ব্যাপারেও গান্ধীজি যে তাঁর নেপথ্য সমর্থন জানিয়েছিলেন, তা হয়ত এক্ষেত্রে অনুঘটকের কাজ করেছিল।

নতুন বছর শুরু। ১৯৪৮। আবারও মনোনীত হলেন মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। এবারের মনোনয়নকারীরা রীতিমতো শক্তিশালী। ১৯৪৬ সালের নোবেল শান্তি জয়ী মার্কিন অর্থনীতিবিদ ও সমাজতাত্ত্বিক এমিলি গ্রিন বালচ, ১৯৪৭ সালের নোবেল জয়ী কোয়েকার সংস্থা দি আমেরিকান ফ্রেন্ড সার্ভিস কমিটি-রা রয়েছে সেই তালিকায়। মনোনয়নের সময়সীমা শেষ হবে ১লা ফেব্রুয়ারি। আর ৩০শে জানুয়ারির বিকালে গান্ধীর শীর্ণ বুক ফুঁড়ে দিল নাথুরামের বুলেট।

তবু নোবেল কমিটির তৎকালীন নিয়ম অনুযায়ী, বিশেষ ক্ষেত্রে মরণোত্তর পুরস্কার দেওয়া যেতে পারত। অন্তত তেমনই একটি তোড়জোড় শুরু হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডঃ সমর সেন সেইসময় নরওয়েতে বক্তৃতা দিতে গিয়ে দেখেছিলেন ইউরোপের বহু বিদ্বজ্জনই গান্ধীজিকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়নি বলে উষ্মা প্রকাশ করেছিলেন। এমিলি বালচ নিজে উদ্যোগ নিয়েছিলেন এই পুরস্কার যাতে গান্ধীজিকে দেওয়া যায়। কিন্তু, শেষপর্যন্ত তা যে হয়নি, তার কারণ, নোবেল কমিটির নিয়ম মতে গান্ধীজির যোগ্য উত্তরসূরি হিসাবে কেউ ছিলেন না, যিনি তাঁর হয়ে পুরস্কারমূল্যটি গ্রহণ করতে পারেন। তাঁর কোনও সংগঠন বা সংস্থা ছিল না, ছিল না কোনও সঠিক উইলও। তাই জন-আবেগের কথা মাথায় রেখে সেবছর আর কাউকেই নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রদান করেনি কমিটি। যুক্তি হিসাবে তারা দেখিয়েছিল - ‘lack of a suitable living candidate.’

যদি সেদিন পিস্তল হাতে কোনো এক নাথুরাম গডসে না থাকতেন...