মৃত্যুও যেন রসিকতা, নবনীতা হাসছেন, বলছেন – ‘কামেন ফাইট’…

প্রতিদিন কাগজের ‘রোববার’-এ নবনীতা দেবসেনের অসুখের খবর পেয়েছিলাম কিছুদিন আগে। তাঁর শরীরের ভিতরে বাসা নিয়েছে ক্যানসার। এমনিতে অসুস্থতা তাঁর দীর্ঘ সঙ্গী। তার মধ্যে ক্যানসারের একটু বেশিই অধিকারবোধ কিনা। তাতে অবশ্য মোটেই ডরাননি নবনীতা। দিব্বি যুদ্ধের কল দিয়েছিলেন। ‘কামেন ফাইট’। পড়ে গায়ে কাঁটা দেয়। তারপরই মনে হল, একা তো লড়ছিলেন না তিনি। ক্রমাগত আমরাও লড়ে চলছিলাম তাঁরই জন্যে। আর জয় গোস্বামীর কবিতার মতোই চাইছিলাম আঙুলে আঙুল আঁকড়ে রাখতে। সব লড়াই-ই ফুরোয় একদিন-না-একদিন। ফুরোল নবনীতা দেবসেনের লড়াইও। চলে গেলেন সুতো গুটিয়ে।

লেখিকা, গবেষিকা, বিদুষী – এই পরিচয়বৃত্তের বাইরেও নবনীতা ছিলেন একজন আশ্চর্য চরিত্র। উচ্ছল জীবনীশক্তিতে টইটম্বুর হয়ে থাকা এক মানুষ।  কিছুতেই যার এক জায়গায় মন টেকে না।  ছোট্ট বয়সে পড়তে বসে কেবলি  স্কিপিং করার কথা মনে হত তাঁর। পায়ের তলায় আজন্মকালই সর্ষে। অসম্ভব শ্বাসকষ্ট নিয়ে আলাস্কা ঘুরে আসতে পারতেন অনায়াসে। আবার সুদূর ফ্রাংকফুর্ট বইমেলায় হাঁপানির ওষুধ ছাড়াই পৌঁছে যেতে পারতেন। আর শেষাবধি  হুইলচেয়ারে করে বইমেলা ঘুরতেও পারতেন। ঘোরা তাঁর থামে না।

আমরা ছোটো ছোটো গণ্ডিতে থাকা মানুষ। নবনীতার এই দস্যিপনা দেখেছি হাঁ-করে। আমরা পারি না যা, নবনীতা পারেন।  চেনার মধ্যে আটকে থাকলেই বোধহয় শরীরের কষ্ট বেড়ে যায় তাঁর। সাহেবদের মতো ট্রাভেল করেন না। তিনি বাস্তবিকই ভ্রমণ-পিয়াসী। সঙ্গী না-পেলে একাই ঘোরেন। পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্ত। বিপদে পড়েন যখন কীভাবে যেন উদ্ধার করার লোকও জুটে যায় । যেন কতদিনের পরিচয়- এমনভাবেই আসে সাহায্যের প্রোপোজাল। লোকে যেন হাত বাড়িয়েই আছে নবনীতার বন্ধুতার আশায়। একবার যেমন তাঁর যাওয়ার কথা ছিল পূর্ব জার্মানি। তার বদলে পৌঁছেছিলেন পশ্চিম বার্লিনে। মধ্যরাতে সেই অসহায় অবস্থায় এক পাকিস্তানি যুবক ও তাঁর স্ত্রী এগিয়ে এসেছিল সাহায্য করতে। এইসবই  বোধহয় মানুষটির জাদুকাঠি।  অচেনা মানুষকে আপন করতে তাঁর এতটুকু দ্বিধা হয় না। আর অজ্ঞাত মানুষও সহজেই ঢুকে পড়েন চেনা-মানুষের গণ্ডিতে। 

ঘুরে বেড়ানোর অক্লান্ত ক্ষমতা চিরকালই ছিল নবনীতার। ঠিক যেন দামাল উড়নচণ্ডী। কথা শোনে না, বার্তা শোনে না – হুট বলে বেরিয়ে পড়লেই হল।  কীভাবে এত শক্তি পেলেন নবনীতা – আমাদের সত্যিই বিস্ময়ের শেষ থাকে না। আরও বিস্মিত করে নবনীতার ভুলে-যাওয়ার ক্ষমতা। শোনা যায়, একবার রয়ালটির চেকও হারিয়ে ফেলেছিলেন তিনি। সঙ্গে ইনকাম ট্যাক্সের কাগজপত্রও। এভাবেই নাকি জগতের আনন্দযজ্ঞে নিমন্ত্রণ পেয়েছিলেন তিনি। তাই সংসারী-জীবনের বাঁধাগৎ আর ধরে রাখতে পারেনি তাঁকে।

সত্যিই কী অফুরান বৈচিত্র‍্য ও বর্ণে ভরা জীবন তাঁর। কত মহান মানুষের সঙ্গেই না তাঁর আলাপ। একে তো গুণী বাবা-মার কন্যা। নামকরণ করেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। শিক্ষক অভিভাবক সঙ্গী বন্ধুবান্ধব হিসেবেও পেয়েছেন কৃতি মানুষদেরই। বড়োই ঈর্ষণীয় লোভনীয় জীবন নবনীতার। ধনরত্নে ভরা। একবার ঝাঁপি খুললেই হল। কত যে গল্প! টুকরোটাকরা জোড়াতাড়া দেওয়া কত যে অভিজ্ঞতা – শুধু যেন সেসব গল্পের খোঁজেই মানুষটির সান্নিধ্যে আজন্ম কাটিয়ে দেওয়া যায়।

আসলে যে জীবনটা, যে সময়টা আমাদের কাছে রূপকথার মতো, নবনীতা হলেন সেই যুগের শেষ বাসিন্দাদের একজন। তাঁর কাছে তাই গুটিগুটি গিয়ে বসতে ভালো লাগে গল্প শোনার লোভে। আমাদের পুরাতন প্রাণের টান মিশে আছে যেসব সময়ের তীরে, তার হদিস জানতেন নবনীতা। আমাদের হারানো-শিকড়ের গল্প। তাই সমস্ত অসুখ কাটিয়ে সেরে ওঠার দরকার ছিল তাঁর। বদলে, চলে গেলেন, সবাইকে ফাঁকি দিয়ে…

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here