পাঁচ বছর পর প্রত্যাবর্তন ‘বিলু রাক্ষস’-এর, গ্রন্থাকারে প্রকাশিত চিত্রনাট্য

“ভাবতে অবাক লাগছে, একটা ছবিতে আমার কোনো ভূমিকা নেই, আমি অভিনয়ও করিনি, তাও সে-ছবির জন্য আজকে এখানে এসেছি। মনে হচ্ছে, আমিও এই ছবির অংশ। ছবির সঙ্গে যুক্ত থেকেই যে ছবিতে অংশগ্রহণ করা যায়, তা নয়। অনেক সময় উপলব্ধির মধ্যে দিয়েও কোনো ছবির অংশ হয়ে ওঠা যায়। ‘বিলু রাক্ষস’ আমার জীবনে তেমনই একটা ছবি।”

বলছিলেন ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত। প্রসঙ্গ, ‘বিলু রাক্ষস’-এর চিত্রনাট্য প্রকাশ। আজ নন্দন-২ প্রেক্ষাগৃহে প্রকাশিত হল তানিয়া আলী বসুমল্লিক সম্পাদিত ‘বিলু রাক্ষস : সম্পূর্ণ চিত্রনাট্য ও অন্যান্য প্রসঙ্গ’ গ্রন্থটি। প্রকাশের নেপথ্যে ‘কলিকাতা লেটারপ্রেস’। এই প্রকাশনা থেকেই প্রকাশিত হয়েছিল ‘বাকিটা ব্যক্তিগত’ চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যও। সেই উপলক্ষে নন্দন-২ প্রেক্ষাগৃহজুড়ে চাঁদের হাট। ছবির অভিনেতা জয় সেনগুপ্ত, অভিনেত্রী কাঞ্চনা মৈত্র, সুরকার জয় সরকার ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বরুণ চন্দ, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরা। ঋতুপর্ণার কথার মতো সিনেমায় অংশগ্রহণ না করেও তাঁরা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িয়ে রয়েছেন ‘বিলু রাক্ষস’-এর (Bilu Rakkhosh) সঙ্গে। 

পাঁচ বছর আগে মুক্তি পেয়েছিল যে ছবি, এ যেন তার দ্বিতীয় মুক্তি। ‘কলিকাতা লেটারপ্রেস’-এর কর্ণধার ও প্রকাশক পলাশ বর্মণ বলছিলেন, “এই বইয়ের গোটা নাম ‘বিলু রাক্ষস : সম্পূর্ণ চিত্রনাট্য ও অন্যান্য প্রসঙ্গ’। এই অন্য প্রসঙ্গের মধ্যে আছে, বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত বিলু রাক্ষস ছবিটির নানান রিভিউ। শুধু তাই নয়, এমনকি গণমাধ্যমেও ‘বিলু রাক্ষস’-কে নিয়ে যাঁরা লিখেছিলেন, সে-সবও যথাসম্ভব সংকলিত হয়েছে এই বইটিতে।” এক অর্থে, বিভিন্ন রকমের মূল্যায়ন এবং গণমাধ্যমকে একত্রিত করে দুই মলাটের মধ্যে ঢুকিয়ে আনার এই প্রয়াস একটু ব্যতিক্রমী। 

আরও পড়ুন
অস্তিত্বজুড়ে যখন খেলা করে বিপন্ন সময় : ইন্দ্রাশিস আচার্যের সিনেমা

আরও পড়ুন
'আমার নতুন সিনেমা ওঁকে পাঠাতে বলতেন', কিম কি-দুকের স্মৃতিচারণায় ইন্দ্রাশিস আচার্য

‘বিলু রাক্ষস’ সিনেমাটিও তো কম ব্যতিক্রমী নয়। পরিচালক ইন্দ্রাশিস আচার্যের পূর্ণদৈর্ঘ্যের প্রথম ছবি এটি। স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে ইন্দ্রাশিস বলছিলেন, তিনি স্বপ্ন দেখতেন একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি করার। এর আগে বেশ কয়েকটি স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি বানিয়েছিলেন ইন্দ্রাশিস। কিন্তু ‘বিলু রাক্ষস’-ই স্বপ্নপূরণ করেছিল তাঁর। এই ছবি জন্ম দেওয়ার তৃপ্তি ইন্দ্রাশিস আচার্যের মধ্যে আজও বহমান। তবে কোনো সৃষ্টিই তো তার স্রষ্টাকে সম্পূর্ণভাবে তৃপ্তি দিতে পারে না। তাই ইন্দ্রাশিসের আজ মনে হয়, এখন বানালে 'বিলু রাক্ষস' ছবিতেও বেশ কিছু পরিবর্তন করতেন। সম্ভব হলে, একটা থই থই শূন্যতা ঘেরা বাড়িতে বিলুর আর্তনাদ বুনে দিতেন তিনি। 

আরও পড়ুন
“আমি চাই, আমার সিনেমা দর্শককে বিব্রত করুক, অস্বস্তিতে ফেলুক”— ইন্দ্রাশিস আচার্যর সঙ্গে একটি আড্ডা


যে-কোনো প্রথম ছবির সঙ্গেই নানাবিধ গল্প জুড়ে থাকে। ‘বিলু রাক্ষস’-ও তার ব্যতিক্রম নয়। 'বিলু রাক্ষস' বড়ো প্রোডাকশন হাউসের ড্রিম প্রোজেক্ট নয়। এর পিছনে বিপুল অর্থলগ্নি ছিল না। এক কথায় ইনডিপেন্ডেন্ট। অভিনেতা জয় সেনগুপ্ত বলছিলেন, বিভিন্ন মানুষের ‘কোলাবরেশন’ এই ছবির জনক। ইন্দ্রাশিসের বক্তব্যে বার বার উঠে আসছিল তাঁর বন্ধুদের কথা। তাঁরা পাশে না দাঁড়ালে এ-ছবি হত না। জয় সেনগুপ্তের সঙ্গে ইন্দ্রাশিস আচার্যের আলাপটিও বেশ মজার। সেই কথাও উঠে এল জয় সেনগুপ্তের স্মৃতিচারণায়। ‘খোলা হাওয়া’ চলচ্চিত্রে ছোটো একটি দৃশ্যে অভিনয় করেছিলেন ইন্দ্রাশিস। সেই পরিচয়। তারপর সেই পরিচয়ই জড়িয়ে গেল এই সিনেমায় যুগলবন্দিতে।  

ছবি তৈরি হল। সে-ছবি তৈরি হওয়া ঘিরেও কত গল্প। বাজেট কম। মাত্র ২০-২১ দিনের মধ্যে ছবির শ্যুটিং শেষ করতে হবে। তার জন্য এক একদিনে ৯-১০টি করে দৃশ্য তোলার কথা বলছিলেন অভিনেতা জয় সেনগুপ্ত। এর মধ্যেই ছবির আউটডোর শ্যুটিং-এর জন্য উত্তরবঙ্গ যাওয়া। এদিকে ফ্লাইট ক্যানসেল। বাধ্য হয়েই ট্রেনের স্লিপার ক্লাসে আটজনের কনফার্ম টিকিটে ১২ জনের উত্তরবঙ্গ যাওয়া। যার মধ্যে রয়েছেন কনীনিকার মতো খ্যাতনামা অভিনেত্রী। স্লিপার ক্লাসের যাত্রীদের উৎসুক চোখ অবাক হয়ে দেখছে তাঁকে। ট্রেনে যাওয়ায় দেড় দিনের শ্যুটিং নষ্ট। তার জন্য দৃশ্যেও কাটছাঁট। মনিটার নেই, জেনারেটর নেই। তার মধ্যেই শ্যুটিং শেষ হল। সে-ছবি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেল। নানা জায়গায় প্রশংসাও পেল। 

প্রশংসার কথা বলতে গিয়ে ইন্দ্রাশিস আচার্যের কথায় উঠে এল এক অদ্ভুত স্মৃতিকথন। দ্বিতীয় সিনেমা ‘পিউপা’ নিয়ে এশিয়ার এক বিখ্যাত চলচ্চিত্র উৎসবে গেছেন তিনি। সেই ফিল্ম ফেস্টিভালের অন্যতম কর্ণধারকে সে-সময় তিনি দেখিয়েছিলেন ‘বিলু রাক্ষস’। সিনেমাটি দেখার পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বলেছিলেন, ‘বিলু রাক্ষসের মতো ছবি ভারতে তৈরি হচ্ছে জানাই ছিল না। ছবিটা আগে দেখতে পেলে আমরা প্রিমিয়ার করতাম।’ ইন্দ্রাশিস আচার্য ফোন খুলে দেখিয়েছিলেন তাঁরই পাঠানো ই-মেইল। এই সিনেমাকে নাকচ করেছিলেন তিনি। লজ্জিত হয়ে তিনি বলেছিলেন, পরবর্তীতে ইন্দ্রাশিসের যে-কোনো সিনেমাই প্রিমিয়ার করবেন তাঁর চলচ্চিত্র উৎসবে। বলাই বাহুল্য, এ-ধরনের নানা গল্পই জড়িয়ে আছে ‘বিলু রাক্ষস’-এর সঙ্গে। 

মুক্তির পর টানা পাঁচ সপ্তাহ নন্দনে চলেছিল ‘বিলু রাক্ষস’। পরবর্তীতে ওটিটি প্ল্যাটফর্মেও এই ছবি দেখেছেন বহু মানুষ। তা সত্ত্বেও মুক্তি পাওয়ার পাঁচ বছর পেরিয়ে, বিলু রাক্ষসের শো আছে শুনে ভিড় জমান অসংখ্যা দর্শক। উপচে ওঠে নন্দন-২ প্রেক্ষাগৃহ। বিভিন্ন মানুষের কথায় উঠে আসে নানান স্মৃতি। বরুণ চন্দ বলছিলেন, ইন্দ্রাশিস আচার্যের ছবিতে চমকপ্রদ একটি টেকনিক দেখা যায়। একটি বাড়ির দোতলা বারান্দা। সেখানে একটা দরজা খুলছে, আবার বন্ধ হচ্ছে। দরজা দিয়ে একটি চরিত্র বেরিয়ে পাশের আরেকটি দরজায় কড়া নাড়ছে। অথচ এই গোটা সময়টা জুড়ে ক্যামেরা স্থির। বরুণ চন্দ বলছিলেন, “এখনকার হ্যান্ডহোল্ড ক্যামেরা কিংবা ট্রলি শটের দুনিয়ায় এইরকম টেকনিক সচরাচর দেখা যায় না। এক সময় দেখা গেলেও, ভারতীয় চলচ্চিত্রে এই টেকনিক এখন বিরল।” ‘বিলু রাক্ষস’ নিয়ে নিজের অনুভূতির কথা বলছিলেন অভিনেত্রী কাঞ্চনা মৈত্র-ও। এই ছবিকে নানাজন ব্যাখ্যা করেছেন নানাভাবে। তবে অভিনেতা জয় সেনগুপ্তের কথায়, এই ছবি ইন্দ্রাশিস আচার্যের আত্মজীবনীর প্রতিফলন। একজন কর্পোরেট চাকুরের ব্যক্তিগত অস্বস্তি, দ্বন্দ্ব— একদিকে ছবি করার আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে বাঁধা ধরা জীবন— এর মাঝে দু-নৌকায় পা দিয়ে চলতে না পারা একটা মানুষের যন্ত্রণা অন্য প্রতিমা নিয়ে উঠে এসেছিল ‘বিলু রাক্ষস’-এ। এ-কথা যখন জয় সেনগুপ্ত বলছেন, ইন্দ্রাশিস তখন মাথা নিচু করে। প্রতিবাদ করছেন না। তাহলে কি তিনিও স্বীকৃতি দিলেন, এই সিনেমার বিলু পরিচালক নিজেও খানিকটা?

বাইরে তখন ঝমঝম বৃষ্টি নেমেছে। বইপ্রকাশ অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর সাময়িক বিরতি। প্রেক্ষাগৃহ থেকে কিছু মানুষ বাইরে বেরচ্ছেন, আবার ঢুকছেন। অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহে শুরু হচ্ছে ‘বিলু রাক্ষস’ সিনেমার স্ক্রিনিং। পাঁচ বছর পর, আরও একবার। দর্শকদের উৎসাহ, উত্তেজনা এবং ঘোর দেখে মনে হচ্ছিল অভিনেত্রী ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত খুব একটা ভুল বলেননি। এই ছবি নানাভাবে নিজের হয়ে ওঠে সকলের কাছেই। ঋতুপর্ণা যেমন এই ছবি দেখে অনেকক্ষণ কেঁদেছিলেন একটানা, তেমনই পাঁচ বছর পরেও এই ছবি দেখতে আবার নন্দনে ছুটে আসেন বহু দর্শক। 'বিলু রাক্ষস'-এর দ্বিতীয় অধ্যায় আসবে কি আসবে না, তা জানা নেই। তবে এই ছবির স্মৃতি যে এখনও বাংলা চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মধ্যে বহমান, তার সাক্ষী থেকে গেল বৃহস্পতিবারের নন্দন…

ছবি ঋণঃ হিয়া ভূঁইয়া

Powered by Froala Editor

More From Author See More

Latest News See More