ঈর্ষাক্ষাৎকার: বিশ্বজিৎ রায় — প্রথম পর্ব

বিশ্বজিৎ রায়ের জন্ম ১৯৮২ সালে, নদিয়া জেলার রাণাঘাটে। কর্মসূত্রে আলিপুরদুয়ার জেলার পীযূষকান্তি মুখার্জি মহাবিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের প্রধান ও সহকারী অধ্যাপক। পশ্চিমবঙ্গে ভূ-প্রত্নতত্ত্ব চর্চার অন্যতম মুখ। লিখেছেন অসংখ্য গবেষণামূলক প্রবন্ধ। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আনুলিয়া-দেবলগড় প্রত্নক্ষেত্রের ইতিহাস-সন্ধানে রত। বর্তমান কথোপকথনটি আবর্তিত হয়েছে তাঁর ‘দেবলগড় আনুলিয়া প্রত্নক্ষেত্র: হারানো এক ইতিহাসের সন্ধানে’ বইটিকে(প্রকাশ ২০২১) কেন্দ্র করে। কথোপকথনে বিশ্বজিৎ রায়ের সঙ্গী তন্ময় ভট্টাচার্য। আজ প্রথম পর্ব।


তন্ময়— আপনি তো ভূগোলের অধ্যাপক। আঞ্চলিক ইতিহাস বা প্রত্নক্ষেত্র নিয়ে আগ্রহ জন্মাল কীভাবে? পাশাপাশি, জিও-আর্কিওলজি— যার বাংলা করলে দাঁড়ায় ভূ-প্রত্নতত্ত্ব— বিষয়টি সাধারণ বাঙালির কাছে আজও অজানা। আপনার গবেষণা ও অনুসন্ধান-প্রক্রিয়ায় এই জিও-আর্জিওলজির ভূমিকা কী?

বিশ্বজিৎ রায়— প্রশ্নের প্রথম অংশটার উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করি আগে। সেটা হচ্ছে, ভূগোলবিদ হিসাবে বিশেষ করে আমার পিএইচডির গবেষণার কাজটা যখন চলছিল, ২০০৮-০৯, তখন নদিয়া জেলার বিভিন্ন অঞ্চলগুলোকে পায়ে হেঁটে হেঁটে ঘুরে দেখা— সেইটার একটা প্রয়োজনীয়তা ছিল। এটা করতে গিয়ে নদিয়ার বিভিন্ন প্রান্তের নদ-নদী, বর্তমানে যে নদ-নদীগুলো অবলুপ্ত হয়ে গেছে, সেই অংশগুলিকে দেখার বা সেই নদীখাতের চেহারাগুলোকে বোঝার চেষ্টা করার সুযোগ আমার হয়েছিল। এই কাজটা মোটামুটিভাবে চলে ২০১৩ সাল অবধি। এই ’১৩ সালের মধ্যে নদিয়া জেলার বেশ কিছু জায়গা আমার চোখে পড়ে যেগুলো স্থানীয় ভূগোলের ব্যাখ্যা দিয়ে আমি মেলাতে পারছিলাম না। যেমন আমি দেখছিলাম, কোথাও মাটির বিরাট উঁচু উঁচু ঢিবি হয়ে রয়েছে। আমার ভূগোলের যে ব্যাখ্যা, সেখান থেকে আমি জানি নদিয়া হল ব-দ্বীপ সমভূমির একটা অংশ। এবং সেখানে এই বিরাট আকারের উঁচু-উঁচু ঢিবি থাকার কোনো কথা নয়। তাহলে এই ঢিবিগুলো এখানে কেন এল? বা আজকে যেগুলি নদিয়ার প্রধান নদী, যেমন প্রথমেই যাদের কথা বলতে হয় গঙ্গা, জলঙ্গি— তারপর এর থেকে ছোটো নদীগুলি, যেমন চূর্ণি, যমুনা বা বর্তমানে যে নদীগুলি অবলুপ্ত হয়ে গেছে, যাদের চেহারাগুলো এখনও কিছু কিছু জায়গায় চোখে পড়ে, খুঁজে পাওয়া যায়— সেই নদীগুলোকে নিয়েও আমার কাজ চলছিল। এবং এইটা করতে করতেই আমি ক্রমশ উপলব্ধি করতে পারি যে শুধুমাত্র ভূমিরূপবিদ্যা, যাকে ইংরাজিতে জিও-মরফোলজি বলব, সেই জিও-মরফোলজি দিয়ে আমি নদিয়ার এই অংশগুলোর ব্যাখ্যা করতে পারছি না।

এবার প্রশ্নের দ্বিতীয় অংশটায় আসি। জিও-আর্কিওলজি। সৌভাগ্যবশত ভূগোল এমন একটা শাস্ত্র বা এমন একটা বিষয় যার পরিধি বহু বহুদূর বিস্তৃত। উদাহরণ-স্বরূপ বলতে গেলে, যেমন কোনো একটা অঞ্চলের ভূমিরূপ গড়ে উঠছে, সেখানকার মাটি কীভাবে গড়ে উঠছে, সেটা যেমন আমাদের পড়ানো হয়, তেমনি আমরা পড়ার সুযোগ পাই ইতিহাস নিয়েও। হিস্টোরিক্যাল জিওগ্রাফি বা ঐতিহাসিক ভূগোল বলে আলাদা ব্রাঞ্চ অফ নলেজ জিওগ্রাফির মধ্যেই কিন্তু রয়েছে। বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের সংস্কৃতি ও সংস্কৃতির বিবর্তন— এগুলোকে জানার সুযোগও আমাদের ভূগোলের কাঠামোর মধ্যে দাঁড়িয়েই হয়। সাংস্কৃতিক ভূগোল বা কালচারাল জিওগ্রাফি। ভূগোল এমন একটা শাস্ত্র যেটা আমাদের এই বহুধা বিস্তৃত পরিধিগুলোতে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়। আমি সৌভাগ্যবান যে, ভূগোলের একজন ছাত্র হিসাবে সেই জায়গাগুলোতে, সেই ক্ষেত্রগুলিতে পড়ার সুযোগ আমার হয়েছে। যেটা বেশ কিছুটা নতুন, যে শাখাটার চর্চা বাংলায় পল্লবিত হচ্ছে ক্রমশ, আগে খুব বেশি পরিচিতি পায়নি, সেটা হচ্ছে ভূ-প্রত্নতত্ত্ব বা জিও-আর্কিওলজি।

ঈর্ষাক্ষাৎকার: কানাইপদ রায় — প্রথম পর্ব


তন্ময়— নদিয়ার ভূমিরূপ ও নদ-নদীগুলিকে জিও-আর্কিওলজি দিয়ে কীভাবে চিনব আমরা?

বিশ্বজিৎ রায়— এইটা বলতে গেলে, একটা খুব বিখ্যাত কবিতা আছে, ‘সেভেন এজেস অফ ম্যান’— এইটা আমাদের মাথায় খুব চমৎকারভাবে খেলে যায়। সেটা হচ্ছে, আজকে যে শিশুটি ভূমিষ্ঠ হল, সে তার শৈশব, কৈশোর, পরিণত পর্যায়— এর মধ্যে দিয়েই সে একদিন বুড়ো হয়ে যাবে। ঠিক যেন গাছের কচি পাতাটা, ক্রমশ ফুটে উঠে তারপর সে একদিন ঝরে পড়বে। সেই পাতাটা থেকেই আবার একদিন একটা কচি পাতা, একটা কিশলয়ের জন্ম হবে। তা মানুষের জীবনটাও এরকম। এবার ভূমিরূপ বিবর্তনের ক্ষেত্রেও, মানুষের জীবনের এই পর্যায়গুলোর সাথে সাযুজ্য রেখে ভূমিরূপ বিবর্তনেরও বিভিন্ন পর্যায়গুলোও কিন্তু ভূগোল শাস্ত্রের অন্তর্গত, ভূমিরূপবিদ্যার অন্তর্গত। এবং সেখানে আমরা দেখি যে, ভূমিরূপ ক্রমশ বদলায়। যে ভূমিরূপটা তৈরি হল আজকে, সে পরিণতি লাভ করে। এবং তারপর একটা সময় তার বার্ধক্য অবস্থাও উপস্থিত হয়। এগুলো আমরা ভূমিরূপবিদ্যার মধ্যেই দেখি।

এখানে আমি একটু বলে রাখি, নদিয়ার যে অংশটা নিয়ে আমরা কথা বলছি, এই পুরো অংশটাই কিন্তু ভূমিরূপগতভাবে গাঙ্গেয় ব-দ্বীপের অংশ। এবং আমরা এটাও জানি, মোটামুটি বহরমপুর থেকে শুরু করে সুন্দরবনের একদম দক্ষিণতম প্রান্ত পর্যন্ত— এই যে মাত্রা ছাড়া ব-এর মতো— এটা গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ। এই গাঙ্গেয় ব-দ্বীপকে ভূমিরূপের গঠনগত শ্রেণীবিন্যাস হিসাবে আমরা মূলত তিনটি ভাগে ভাগ করতে পারি। আমি যদি পুরোটা না বলে, নদিয়া নিয়ে বলি তবে সংক্ষিপ্ত হয় আলোচনাটা। নদিয়ার যেটা উত্তর ভাগ, যেমন তার মধ্যে ব্লক যেগুলো পড়ে— করিমপুর-১, করিমপুর-২, তেহট্ট-১, তেহট্ট-২— এই যে ব্লকগুলো বা ভৌগোলিক অঞ্চলগুলো, এদেরকে আমরা বলি মৃতপ্রায় ব-দ্বীপ। মৃতপ্রায় ব-দ্বীপ কেন? কারণ, এই অঞ্চলগুলোতে ব-দ্বীপ গঠনের কাজটা শেষ হয়ে গেছে। এখানে আর ব-দ্বীপ গঠিত হচ্ছে না। এর একটু নিচে নেমে আসি এবার— নাকাশিপাড়া, কালীগঞ্জ, কৃষ্ণনগর, রাণাঘাট— এই যে অঞ্চলগুলো, এই অঞ্চলগুলোকে আমরা বলছি পরিণত ব-দ্বীপ। এখানে ব-দ্বীপ গঠনের কাজ একেবারে শেষ হয়ে গেছে, তা নয়। হচ্ছে। কিন্তু তার ফ্রিকোয়েন্সিটা অনেক কমে গেছে। মানে দুটি ফ্রিকোয়েন্সির মাঝের ইন্টারভালটা অনেক বেশি। সাধারণভাবে দেখা যাচ্ছে, হয়তো গোটা শতাব্দী মিলিয়ে ৪টে বড়ো বন্যা হচ্ছে। বড়ো বন্যা মানে, পলি সঞ্চয়ের সুযোগ পাচ্ছে। আমরা জানি, ’৭৮ সালে একটা বড়ো বন্যা হয়েছে, ২০০০-এ একটা। হয়তো ’২৫ কি ’৩০-এ একটা বড়ো বন্যা হবে, আবার ’৫০ বা ’৬০-এ আবার। এইভাবে দেখা যাচ্ছে যে একটা শতাব্দীতে চারটে বড়ো বন্যা এই অঞ্চলটিকে পলিতে আবৃত করছে। তার মানে কী? এই অঞ্চলটি একদম মরে গেছে, এটা বলতে পারি না। তার মানে মৃতপ্রায় নয়, কিন্তু পরিণত। ফ্রিকোয়েন্টলি হচ্ছে না। আর নদিয়ার একদম দক্ষিণ ভাগটা আর ২৪ পরগনার অংশটা— এটাকে আমরা বলছি সক্রিয় ব-দ্বীপ। কারণ, এখানে ব-দ্বীপ গঠনের কাজটা চলছে। নদ-নদীগুলোয় জোয়ার-ভাটা খেলছে, এক পাড় ভাঙছে, আরেক পাড় গড়ে তুলছে— ব-দ্বীপ গঠনের কাজটা প্রতিনিয়ত চলছে। কাজেই এটা সক্রিয় ব-দ্বীপ। আর একেবারে যে দক্ষিণ দিকটা— সুন্দরবনের অংশটা, সেটা তো সক্রিয় বটেই, তাকে আমরা আবার টাইডাল ডেলটা বলছি। মানে ওখানে প্রতিদিন হচ্ছে। জোয়ার-ভাটার সঙ্গে সঙ্গে হচ্ছে। ওখানে আর বছরের অপেক্ষা নেই। তা এই যে ভাগটা আমি বললাম, সেই ভাগটা বললে সেভেন এজেস অফ ম্যান বা ভূমিরূপ পরিবর্তনের যৌবন, পরিণত, বার্ধক্য— এই পর্যায়টা মেনে একটা স্বাভাবিক প্রশ্ন মনে উঠে আসে। আজ যা মৃতপ্রায় তার তো কোনোদিন যৌবন ছিল! আজ যে নদী মৃতপ্রায়, আজ স্রোতস্বিনী রুদ্ধ, সেই স্রোতস্বিনী তো কোনো না কোনোদিন যৌবনবতী ছিল! তার হদিশ আমাকে কে দেবেন? আমার ভূগোলের বর্তমান যে বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা, সেই বিশ্লেষণ-ব্যাখ্যা থেকে বেশ কয়েক শতাব্দী আগের ভূমিরূপ গঠনকে চিহ্নিত করতে পারি না। এটা হচ্ছে, বর্তমান ভূমিরূপবিদ্যার সীমাবদ্ধতা। এখান থেকেই জন্ম নেয় ভূ-প্রত্নতত্ত্ব বা জিও-আর্কিওলজি।


তন্ময়— ইতিহাস অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে ভু-প্রত্নতত্ত্বের ভূমিকা কেমন?

বিশ্বজিৎ রায়— ধরে নেওয়া যাক দেড় হাজার বছর আগে এই নদী দিয়ে বাণিজ্য হত, এখানে বড়ো বড়ো সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। তাহলে ভূগোলের বর্তমান কাঠামোতে আমি পনেরো শতাব্দী আগের চেহারাটাকে চিহ্নিত করতে পারছি না। কারণ কে বলে দেবে, পনেরো শতাব্দী আগে তো আমরা ছিলাম না কেউ-ই। কিন্তু এখানেই ভূ-প্রত্নতত্ত্ব দারুণভাবে সাহায্য করে। তার কারণ, পনেরো শতাব্দী আগে যদি নগর গড়ে ওঠে বা বসতি গড়ে ওঠে, তাহলে সেই সময়কার সভ্যতার যে চিহ্নগুলি, কালচারাল ট্রেইটগুলি— সেগুলো আমরা উদ্ধার করলেই বুঝতে পারব, এগুলো এই যুগের, এই সময়ের। আমি একটা ছোট্ট উদাহরণ দেওয়ার চেষ্টা করি। দমদমের কাছে ক্লাইভ হাউস। এই কিছুদিন আগে খনন হয়েছে। এই ক্লাইভ হাউস থেকে পাওয়া গেছে গুপ্ত পরবর্তী যুগের বা চতুর্থ-পঞ্চম-ষষ্ঠ শতাব্দীর বেশ কিছু আর্টিফ্যাক্টস, কালচারাল ট্রেইটস। যা আমাদের কাছে উজ্জ্বল প্রমাণ, যে এই সময়কালে এখানে সভ্যতা পল্লবিত হয়েছিল। এটা বুঝতে আমাদের আর কোনো প্রমাণের অভাব রইল না। আমরা চন্দ্রকেতু, দেগঙ্গা, বেড়াচাপা— সেখান থেকে আমরা প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ পেয়েছি, বুঝে যাচ্ছি মৌর্যযুগে এখানে সভ্যতা পল্লবিত হয়েছিল, বিকশিত হয়েছিল। শুঙ্গ যুগেও হয়েছিল। সঙ্গে সঙ্গে আমরা বুঝে গেলাম, আজ থেকে ২২০০-২৩০০ বছর আগে গাঙ্গেয় বদ্বীপের এই অংশে ভূমিরূপ বিকশিত হয়েছিল, সভ্যতা বিকশিত হয়েছিল। আমাদের কাজ হচ্ছে, ভূমিরূপবিদ্যার সাহায্য নিতে হবে, যা থেকে জলনির্গম প্রণালীগুলোর বিকাশটাকে বুঝতে পারি, বিবর্তনটাকে বুঝতে পারি। এবং সেই তথ্যগুলো— সভ্যতার চিহ্ন, প্রত্নপ্রমাণগুলির দ্বারা যেন প্রত্যয়িত হবে। যেমন, এত বছর আগে এই নদীটা এইরকম ছিল। তার প্রমাণ কী? এই সভ্যতার চিহ্নগুলো এখান থেকে পাওয়া যাচ্ছে। ফলে আমরা জিও-আর্কিওলজির অত্যন্ত সম্ভাবনাময় এই ক্ষেত্রটিতে আমরা চর্চা করি, তাহলে মনে হয় আমাদের গাঙ্গেয় ব-দ্বীপের মতো একটি ভূমিরূপ, যা ক্রমশ গড়েছে, আবার ভেঙেছে, সামগ্রিকভাবে বিবর্তিত হয়েছে, তার সম্পূর্ণ চিত্রটা আমরা বোধহয় ভূ-প্রত্নতত্ত্বের মাধ্যমেই খুঁজে পাব। শুধু ভূমিরূপবিদ্যা সাহায্য করতে পারবে না, আবার শুধু আর্কিওলজি বা প্রত্নবিদ্যাও আমাদের সাহায্য করতে পারবে না। 

আর্কিওলজিস্টরা বা পুরাতাত্ত্বিকরা কী করবেন? তাঁরা পরীক্ষানিরীক্ষার দ্বারা বা উৎখনন দ্বারা ওই সভ্যতার রেণুগুলোকে, আর্টিফ্যাক্টসগুলো আবিষ্কার করতে পারবেন। কিন্তু সেইসময়ের ভূগঠনটা কেমন ছিল, নদী-নকশাটা কেমন ছিল, কোন নদী কোথা দিয়ে বয়ে যেত, কোন পথে বাণিজ্য হত— এটা জানার জন্য কিন্তু ভূগোলের জ্ঞান আবশ্যিক। এটার জন্য ভূমিরূপবিদ্যার জ্ঞান আবশ্যিক। তো আজকের সময় হয়েছে যখন এই ভূমিরূপবিদ্যার জ্ঞান এবং আর্কিওলজি বা পুরাতত্ত্বের জ্ঞান— এই দুটোকে সিন্থেসাইজ করে আমাদের নতুনভাবে এগিয়ে যেতে হবে। তবে কিন্তু আমরা আমাদের দেশ-কাল-সময়কে আরও নিবিড়ভাবে জানতে পারব। এইটাই বোধহয় জিও-আর্কিওলজির সম্ভাবনাক্ষেত্র। বা যেটা বললে তুমি, কী করা যেতে পারে জিও-আর্কিওলজি দিয়ে, তার একটা ধারণা। সামগ্রিকভাবে জিও-আর্কিওলজির চর্চা সেভাবে পল্লবিত হয়নি, সীমাবদ্ধ রয়েছে এখনও, কিন্তু এর একটা বিস্তৃত ক্ষেত্র রয়েছে, যে ক্ষেত্রটিতে আমরা যত বেশি হাঁটতে থাকব, তত বেশি আমরা ভূগোলের এই নতুন উঠোনটাকে আবিষ্কার করতে পারব।

ঈর্ষাক্ষাৎকার: কানাইপদ রায় — দ্বিতীয় পর্ব


তন্ময়— পরের প্রশ্নে আপনার গবেষণার বিষয়ে সরাসরি ঢুকে যাই। রাণাঘাটের উপকণ্ঠে যে আনুলিয়া, যার প্রাচীন নাম অনলগ্রাম, যেখানে আমি একাধিকবার গেছি, বটগাছের নিচে যে প্রাচীন দশম-একাদশ শতাব্দীর বিষ্ণুমূর্তি আছে, সেটা দেখেছি। চূর্ণি নদীর ধারেও মৃৎপাত্র, মাটির গোলক, ইত্যাদি দেখা গেছে। এগুলো কোন প্রাচীন সভ্যতা বা ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে?

বিশ্বজিৎ রায়— প্রথমে একটা রেকর্ডেড রেফারেন্সের কথা বলি। ২০১৮ সালে একটা বই প্রকাশিত হয়েছে। রূপেন্দ্রকুমার চট্টোপাধ্যায়। সেখানে রূপেনবাবুর মতো একজন প্রশিক্ষিত পুরাতত্ত্ববিদ, এবং বিশেষজ্ঞ তিনি, এই ব্যাপারে তাঁর বলা কথা অবশ্যই মান্যতাযুক্ত। তিনি পরিষ্কার ছাপার অক্ষরে লিখেছেন, আনুলিয়া থেকে তিনি তাঁর পরীক্ষায় বিআরডব্লু পেয়েছেন। ব্ল্যাক অ্যান্ড রেড ওয়্যার। কালো-লাল মৃৎপাত্র। এটা একটা বিশেষ ধরনের মৃৎপাত্র, যার একদিকটা লাল, অপরদিকটা কালো। এই মৃৎপাত্রটা সাধারণভাবে ওই খ্রিস্টপূর্বাব্দ সময়কেই চিহ্নিত করে। পশ্চিমবঙ্গের শুধু নয়, বৃহত্তর বঙ্গ। বৃহত্তর বঙ্গের যেগুলো উল্লেখযোগ্য প্রত্নক্ষেত্রগুলো— নাম ধরে বলতে গেলে, চন্দ্রকেতুগড়, বাণগড়, তারপর মোগলমারি, উয়াড়ি-বটেশ্বর, মহাস্থানগড় এবং অবশ্যই পাণ্ডু রাজার ঢিবি— এই সমস্ত প্রত্নক্ষেত্রগুলো থেকে কিন্তু বিআরডব্লু পাওয়া গেছে। অর্থাৎ এই যে জায়গাটা, আনুলিয়া, তার সাংস্কৃতিক যোগাযোগ এতটাই পুরনো, এটা কিন্তু রূপেনবাবুর মতো বিশেষজ্ঞও অলরেডি লিখে ফেলেছেন। সাধারণভাবে আমার যেটা অবজারভেশন, আনুলিয়া-দেবলগড় প্রত্নক্ষেত্রের সবচেয়ে আকর্ষণীয় যে জায়গাটা, সেই জায়গাটা হল নদীগুলির বিন্যাস এবং এখানেই ভৌগোলিক জ্ঞান পুরাতত্ত্বের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত।


তন্ময়— নদী বিন্যাসের প্রসঙ্গে পরে আসছি। আমার যেটা নির্দিষ্টভাবে জানতে চাই, খ্রিস্টপূর্ব সময় থেকে একাদশ বা দ্বাদশ শতাব্দী অবধি আনুলিয়ায় কীরকম সভ্যতার বিবর্তনটা ঘটল? তার পরের ঘটনাক্রমই-বা কীরকম?

বিশ্বজিৎ রায়— আনুলিয়া থেকে বিআরডব্লু পাওয়া গেল। আনুলিয়া থেকে পাল-সেন যুগের প্রচুর প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়া গেল। এবং আনুলিয়া থেকে যে প্রত্নপ্রমাণ নদী বিবর্তনের প্রমাণগুলি পাওয়া গেল, সেখান থেকে বোঝা যায় যে, খ্রিস্টপূর্ব সময় থেকে একেবারে পাল-সেন যুগ পর্যন্ত এখানে সভ্যতা বিকশিত হয়েছিল। এবং তারপরে এখানে, মধ্যযুগে, মানে সুলতানি যুগ এবং পরবর্তী মোঘল আমলে, এখানে যে সভ্যতা বিকশিত হয়েছিল, তা কিন্তু স্থানীয় মানুষের স্মৃতি বা মৌখিক ইতিহাসে পাওয়া যায় কিন্তু। যেমন, এখানে মোঘলদের ধনাগার ছিল। হয়তো তাঁরা এখানে টাঁকশাল তৈরি করেছিলেন, বা এখানে কোনো স্টোরেজ ছিল। মোঘল ধনাগার আনুলিয়াতে ছিল, এই ইতিহাস ওরাল হিস্ট্রিতে পাওয়া যায়। ফলে, একেবারে খ্রিস্টপূর্ব সময় থেকেই এই জায়গায় বিশেষত নদীগুলিকে কেন্দ্র করে বাণিজ্য চলত। সেটা পরবর্তীতে সুলতানি শাসকেরা এবং মোঘলরাও ব্যবহার করেছিলেন।


তন্ময়— ইতিহাস-বিখ্যাত আনুলিয়ার তাম্রশাসন, যেটা ১৮৯৬ সালে নগেন্দ্রনাথ বসু সম্ভবত আবিষ্কার করেন…

বিশ্বজিৎ রায়— না। তাম্রশাসনটা ১৮৯৮ সালে অক্ষয়কুমার মৈত্র আবিষ্কার করেছিলেন। নগেন্দ্রনাথ বসু পরে রাজন্যকাণ্ডে সেটা লিখেছিলেন।


তন্ময়— হ্যাঁ, ঠিক। গুলিয়ে ফেলেছিলাম। অক্ষয়কুমার মৈত্রই সেটা আবিষ্কার করেছিলেন এবং সেটা থেকে সেন আমলের ভূমিরূপ, বণ্টন ব্যবস্থা, সামাজিক ব্যবস্থার একটা সামগ্রিক চিত্র পাওয়া যায়। পরবর্তীকালে আমাদেরই দুর্ভাগ্য যে বাঙালির যেটা উদাসীনতা, বরেন্দ্র রিসার্চ ইনস্টিটিউট থেকে চিরতরে হাওয়া হয়ে গেল। আনুলিয়া বা অনলগ্রাম— কানাভুষো শোনা যায়, একসময় সে-এলাকায় বৌদ্ধদের আস্তানা ছিল। এখনও ধর্মরাজের পুজো, চড়কের মেলায় সেই ইঙ্গিত মেলে। খুব ভুল যদি না বলি, কুমুদনাথ মল্লিক ‘নদিয়া কাহিনী’তে লিখেছেন, এখন যেখানে বিষ্ণুমূর্তিটা আছে গাছতলায়, স্থাপিত হওয়ার ২০-৩০ বছর আগে সেখানে একটা বুদ্ধমূর্তি ছিল। আনুলিয়ার বৌদ্ধ জনবসতি, বৌদ্ধধর্মের বিকাশ বা চর্চা, পাল-সেন যুগে বৌদ্ধধর্ম থেকে সরে গিয়ে ব্রাহ্মণ্যবাদের বিকাশ— এর আড়ালে কি কোথাও বৌদ্ধ নিপীড়নের গল্প লুকিয়ে? কারণ, অনলগ্রাম নামকরণ নিয়ে যে বিভিন্ন ব্যাখ্যা আছে, তাতে গ্রামটা আগুনে পুড়ে গিয়েছিল, এমন একটা মতও পাওয়া যায়। সেখানে বৌদ্ধ উপনিবেশ এবং বৌদ্ধ থেকে হিন্দুতে শিফটিং— যদি এই বিষয়টা ব্যাখ্যা করেন…

বিশ্বজিৎ রায়— এইটা বলতে গেলে, আমাকে প্রথম খুব সংক্ষিপ্ত একটা রূপরেখা দিতে হবে। বৌদ্ধতত্ত্বের বিবর্তনটা কী? আমরা সাধারণভাবে জানি, স্থবিরবাদী বা থেরোবাদী দর্শন, সেখান থেকে মহাযান দর্শন, এবং সেখান থেকে মন্ত্রযান, বজ্রযান— এই বিভাগগুলো থেকে বিবর্তন হয়ে তারপর তন্ত্রসাধনার একটা কাল। এবং বাংলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল এই তন্ত্রসাধনার একটা ক্ষেত্র ছিল। এবং আজকেও আনুলিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে কিন্তু, সুদূর অতীতে যে এখানে তন্ত্রসাধনা বিকশিত হয়েছিল, তার প্রমাণগুলো আমরা পাই। আমাদেরকে আজকের হিন্দু ধর্মের যে বিবর্তিত রূপ, সেই বিবর্তিত রূপ থেকে বৌদ্ধ দর্শনের চিহ্নগুলোকে খুঁজে নিতে হবে। যেখানে যেখানে গাজন হয়, বুঝে নিতে হবে, এটা বৌদ্ধ দর্শনের প্রভাব। বৌদ্ধ ধর্ম গর্জন— এই উৎসব থেকে গাজনের উদ্ভব। প্রাচীন উলা— যেখানে উলাইচণ্ডীর মেলা হয়, সেই উলাইচণ্ডীর মেলা আর কিছুই নয়, বৌদ্ধ পূর্ণিমার দিন বুদ্ধের উপাসনা। যা আজও বৌদ্ধ পূর্ণিমার দিনই কিন্তু অনুষ্ঠিত হয়। আনুলিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে তন্ত্রসাধনার বহু বহু স্থাননাম আজও খুঁজে পাওয়া যায়। কাপালিপাড়া, বৃদ্ধকোল বা বুদ্ধকোল, নাথ ঘাট— অনুমান করা যায় ইংরেজ আমলে নাথ-এর সঙ্গে একটা ‘এন’ যুক্ত হয়ে নানথ ঘাট বা নন্দী ঘাট এই নামটা এল। আজও গোটা আনুলিয়াজুড়ে যন্ত্র পাওয়া যায়, তন্ত্র উপাসনার যে যন্ত্র, সেগুলি পাওয়া যায়। ফলে আজকের যেটা রাণাঘাট পৌরসভা, চূর্ণি নদীর ধারের যে অঞ্চলগুলো এবং আনুলিয়া, যার প্রাচীন গঙ্গার সাক্ষ্যগুলো বহন করছে, এই সমস্ত জায়গাগুলো তন্ত্র উপাসনাক্ষেত্র ছিল। এবং সাধারণভাবে আমরা জানি, তোমার প্রশ্নের উত্তরে আমি ফিরে আসি, ব্রাহ্মণ্যবাদের বিষয়টি, সেটা হচ্ছে, তন্ত্রসাধনা এবং তন্ত্রসাধনার পরের পর্যায়ে গিয়ে সহজযান… এই সহজযানের পর্যায়ে গিয়ে মানুষ খানিকটা বীতশ্রদ্ধ হয়েছিলেন অজাচারে। অবাধ যৌনাচার এখানে একটা ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। তো সাধারণ মানুষ, গৃহস্থ মানুষ, পরিবার পরিজন নিয়ে থাকা মানুষ— তারা বোধহয় এই অবাধ যৌনাচারে বা অজাচারে বীতশ্রদ্ধ হয়েছিলেন। যে মূল দর্শন গৌতম বুদ্ধ প্রচার করেছিলেন, সেখান থেকে এতটা বিচ্যুতভাবে ধর্মকে গ্রহণ করতে প্রস্তুত ছিলেন না। যে-কোনো সামাজিক ব্যবস্থা যখন চেপে বসে, আমাদের তখন বুঝতে হবে সাধারণ মানুষ কোনো-না-কোনোভাবে তাকে সমর্থন করেছেন, সহযোগিতা করেছেন, নাহলে সেই ব্যবস্থাটা চেপে বসতে পারে না। তাহলে কঠোর ব্রাহ্মণ্যবাদ বাংলায় এভাবে চেপে বসার পেছনে, আমাদের কিন্তু অবশ্যই বৌদ্ধ সহজযানের প্রতি, তন্ত্রসাধনার প্রতি, সাধারণ মানুষের এই বীতশ্রদ্ধ হওয়ার প্রেক্ষিতটাকে মাথায় রাখতে হবে, যে ধর্মযাপন বা ধর্মাচরণ— তার সঙ্গেও অজাচারকে মিশিয়ে ফেলতে বাংলার মানুষ প্রস্তুত ছিলেন না। তাই বোধহয় তাঁরা চেয়েছিলেন ধর্মের একটা পরিশুদ্ধ রূপ, যা কিছুটা গোঁড়া হবে, কিছুটা আগল দেবে সমাজকে। এরকম একটা পরিপ্রেক্ষিত থেকেই হয়তো সেন রাজবংশের আমলে কঠোর ব্রাহ্মণ্যবাদের উদ্ভব হয়, যা এই অজাচারগুলিকে, অবাধ যৌনাচারকে নিন্দনীয় রূপে বর্ণনা করে এবং এক সম্প্রদায়ের সঙ্গে আরেক সম্প্রদায়ের মধ্যেকার মেলামেশাকে বন্ধ করে কঠোর একটা মতাদর্শের আমদানি করে। এবং এ-প্রসঙ্গে বলাই যায় যে, বৌদ্ধ ধর্মাচারণ নিন্দনীয় হয়। এটা নিশ্চয়ই জানো, আজকের বাংলায় হেয়োজ্ঞানে যেসব শব্দগুলির ব্যবহার হয়…


তন্ময়— যেমন ন্যাড়া-নেড়ি।

বিশ্বজিৎ রায়— হ্যাঁ। সেগুলোর অনেকটাই কিন্তু বৌদ্ধ ধর্ম অনুষঙ্গ। ন্যাড়া-নেড়ি তো আছেই, তারপর এই যে বাংলায় বলে না ‘বুদ্ধু’। এই ‘বুদ্ধু’ মানে বুঝতে হবে বুদ্ধ-অনুষঙ্গ। কিংবা চোর-ডাকাত-স্যাঙাৎ। এই ‘স্যাঙাৎ’ এসেছে সঙ্ঘ থেকে। যারা সঙ্ঘের মানুষ তাঁরা স্যাঙাৎ। স্যাঙাৎ তো আমরা ভালো অর্থে ব্যবহার করি না। তো এই সবগুলোই প্রমাণ করে যে, মানুষ হয়তো বৌদ্ধ ধর্মের এই বিচ্যুতির প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন। এই পরিপ্রেক্ষিত থেকেই বাংলায় হয়তো ব্রাহ্মণ্যবাদ জাঁকিয়ে বসার সুযোগ পেয়েছিল, সেন রাজবংশের পৃষ্ঠপোষকতার মধ্যে দিয়ে।


তন্ময়— এবার অনলগ্রামের বিবর্তনটা যদি স্পেসিফিক্যালি বলেন।

বিশ্বজিৎ রায়— অনলগ্রামের বিবর্তনটা বলতে পারব না। তার কারণ এক্সক্যাভেশন ছাড়া, উৎখনন ছাড়া প্রতিষ্ঠিত সত্য তো নেই। স্থাননাম বা বিভিন্ন প্রত্নবস্তু থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে প্রাচীনকালে এই জায়গাটা বৌদ্ধধর্মের একটি বিখ্যাত কেন্দ্র ছিল। এবং বৌদ্ধ ধর্মের আরেকটা ব্যাপার মনে রাখতে হবে, সঙ্ঘগুলো কোথায় গড়ে উঠত? সঙ্ঘগুলো গড়ে উঠত কিন্তু অবশ্যই প্রধান পরিবহন পথের কেন্দ্রে বা পাশে। তার কারণ কী? কেন-না বৌদ্ধ শ্রমণরা থাকবেন, কিন্তু সেখানে তো টাকা-পয়সা আসতে হবে, শ্রেষ্ঠীদের আসতে হবে, ব্যবসায়ীদের আসতে হবে। তো যদি বাণিজ্যপথের বা পরিবহন পথ থেকে গভীর জঙ্গলের মধ্যে হয়, তবে সেখানে তো ধর্মাচরণ হবে না। এটাই কিন্তু কারণ যে, প্রাচীন বৌদ্ধ মঠগুলি অনেকটা স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্থনীতি বিকাশ করেছিল। তো আনুলিয়া বা প্রাচীন অনলগ্রামের যে জিও-পলিটিক্স বা অবস্থানগত বৈশিষ্ট্য সেটাও কিন্তু আমাদের এই হাইপোথিসিসের সঙ্গে মিলে যায়। কারণ, আনুলিয়া অতি প্রাচীনকাল থেকেই গঙ্গা দ্বারা কানেক্টেড। এবং ওই প্রাচীন গঙ্গার যে খাত, আজকের চূর্ণির যে খাত, তার পাশেই যে বিরাট ঢিবি হয়ে রয়েছে, যেখানে অবশ্যই সভ্যতার চিহ্ন উৎখনন হলে আবিষ্কৃত হবে। সেইগুলো কিন্তু প্রমাণ দিচ্ছে, প্রাচীন জলপথের বা নৌ-বাণিজ্যপথের প্রান্তে এরা অবস্থান করত। দুই, এখানকার যে স্থানীয় নাম বা স্থাননামগুলি, সেগুলো তন্ত্রসাধনার, প্রাচীন বৌদ্ধ তন্ত্র-অনুষঙ্গের প্রমাণ দিচ্ছে। যেমন আমি বললাম, কাপালিপাড়া, নাথঘাট, বুদ্ধকোল…


তন্ময়— বা বিভিন্ন ধর্মীয় মেলা বা ধর্মীয় উৎসব...

বিশ্বজিৎ রায়— এক্সাক্টলি। আজকের দিনেও কিন্তু আনুলিয়া-জুড়ে গাজন মহাসমারোহে পালিত হয়। আজকের দিনেও তুমি যদি আনুলিয়া ঘোরো, তাহলে দেখবে ওই যে গোল-গোল পাথর, যেগুলো বৌদ্ধদের শূন্যবাদের প্রতীক— এগুলো নিয়ে বহু লেখালিখি নবদ্বীপ অঞ্চলে হচ্ছে। নবদ্বীপে যেগুলো শিব বলে পুজো হয়, সেগুলো কোনোটাই শিব নয়। এগুলোর বয়স কিন্তু অনেক প্রাচীন। এরা কিন্তু সেই ওই বৌদ্ধ শূন্যবাদের প্রতীক। দণ্ডপাণিতলা, যুগপাণিতলা— দেখবে এ সবই প্যারাবোলিক। যা কিনা বৌদ্ধ ধর্মের প্রতীক।

ঈর্ষাক্ষাৎকার: সুপ্রিয় চৌধুরী — প্রথম পর্ব


তন্ময়— তাছাড়াও বৌদ্ধর সঙ্গে শৈবর যে ওভারল্যাপ— সেগুলো তো কিংবদন্তি। মানে পঞ্চানন ধর্মরাজ— এগুলো সব সেখান থেকেই স্খলিত হয়ে আসা। ‘অন্ত্যজ’ শ্রেণি ব্রাহ্মণদের হাতে পড়ে একটা ‘সার্টিফায়েড’ জাতে ওঠার মতো হয়ে উঠল।

বিশ্বজিৎ রায়— একদম, একদম। লোকায়ত ধর্মের বিকাশ সেখান থেকে।


তন্ময়— আনুলিয়াতেই ভ্রমণকালে চূর্ণি নদীর পাশে ছোটো ছোটো পাকা ইটের পাঁচিল চোখে পড়েছে, এমনকী তিন ধাপ র্যা ম্পার্টও কোথাও-কোথাও। সেগুলো সুঠাম একটা নগরীকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসাবে ধরে নেওয়া যায়। সেই নগরী কাদের ছিল বা এই প্রাচীরগুলির নির্মাতা কারা? কোন আক্রমণের ভয়ে বা কীসের আশঙ্কায় ওরকম সূচিভেদ্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নদীর পাড়ে গড়ে উঠল?

বিশ্বজিৎ রায়— বিষয়টা হচ্ছে, এই প্রশ্নের উত্তরটাও ততক্ষণ দেওয়া যাবে না, যতক্ষণ না বৈজ্ঞানিক উৎখননের মাধ্যমে আমাদের কাছে পাথুরে প্রমাণ আসছে। মানে এখানে একটু বলে নেওয়াটা অন্যায় হবে না। আমরা ততটাই কথা বলব, যতটা প্রমাণ আমাদের কাছে থাকবে। মানে আপন মনের মাধুরী মিশায়ে উপন্যাস হতে পারে, কিন্তু সেটা মোটেই ইতিহাস নয়। সেটা মনে হয় আজকের পরিপ্রেক্ষিতে আরও বেশি করে স্মরণে রাখা প্রয়োজন, যখন দেশ-কাল-ভাবনাগুলোকে ক্রমাগত বিনির্মাণের চেষ্টা হচ্ছে। আমরা উৎখননের মাধ্যমে যে প্রমাণ পেয়েছি, সেইটুকুর পরিপ্রেক্ষিতেই বলতে পারব। তো সেই পরিপ্রেক্ষিতে বলতে গেলে, এখনও পর্যন্ত যেসব আর্টিফ্যাক্টস পাওয়া গেছে, যেগুলো বললাম, পাল-সেন যুগের প্রচুর মৃৎপাত্র পাওয়া গেছে। তার মানে পাল-সেন যুগে, অর্থাৎ অষ্টম, নবম, দশম এবং পরবর্তীতে একাদশ, দ্বাদশ— এই সময়টাতে যে এখানে সভ্যতা বিকশিত হয়েছিল, তার প্রমাণটা আমরা পেয়েছি। মানে এইটুকুর ভিত্তিতে আমাদের কথা বলতে হবে। এবং এইটুকুর ভিত্তিতে যদি বলতে হয়, তাহলে বলতে হবে, এইসময়ে এখানে নদীকেন্দ্রিক পরিবহণ বা নৌবাণিজ্য— সেটা বিকশিত হয়েছিল। এবং আমরা তো জানি যে বাংলায় অতিপ্রাচীন কাল থেকে, খ্রিস্টপূর্বাব্দ সময় থেকেই বাণিজ্যকেন্দ্রিক, বিশেষত নৌবাণিজ্যকেন্দ্রিক সভ্যতা খুব শীর্ষস্থানীয় পর্যায়ে পৌঁছেছিল। যার প্রমাণ হচ্ছে গঙ্গারিডি সভ্যতা। তো এখানে যেটা বলা যেতে পারে সেটা হচ্ছে, আমরা গঙ্গারিডি সভ্যতার প্রমাণ পাইনি আনুলিয়ায়। আমরা মৌর্য, শুঙ্গ বা গুপ্তযুগের পাথুরে প্রমাণ পাইনি। কিন্তু আনুলিয়া থেকে আমরা পাল-সেন যুগের বিভিন্নরকম আর্টিফ্যাক্টস, নমুনা বা প্রত্নসামগ্রী পাচ্ছি। তো সেখান থেকে আমরা বলতে পারি এটা পাল-সেন যুগে বিখ্যাত নৌবাণিজ্যকেন্দ্র ছিল। আর নৌবাণিজ্যকেন্দ্র যদি হয়, তাহলে তার তো অবশ্যই একটা অবস্থানগত গুরুত্ব থাকবে। সেখানটাকে সুরক্ষিত রাখতে হবে। কারণ বাণিজ্য মানেই তো টাকা-পয়সা। আর বাণিজ্য মানেই তো সুরক্ষারও প্রয়োজন বটে। নদী দিয়ে যে নৌকাগুলো আসবে-যাবে, বাণিজ্যতরী যেগুলো আসবে-যাবে, সেগুলোকে যাতে নিরাপদে রাখতে পারি এমন ডক আমাকে রাখতে হবে। আবার সেই নৌকাগুলোকে, বণিক শ্রেণিকে রক্ষা দিতে পারে, এমনটা একটা অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সিকিওরিটি দিতে হবে… অর্থাৎ, অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সেটআপের দরকার পড়ছে। এমন একটা অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সেটআপের কেন্দ্র হতে পারে, আনুলিয়ার ধারে যে বিরাট উঁচু ঢিবিগুলো দেখছি। নাম ধরে বললে, কাপালিপাড়া এবং বিভিন্ন জায়গায় নদীর একদম পাড় ধরে উঁচু উঁচু ঢিবি দেখেছি, এবং সেই ঢিবি থেকে বহু বহু মৃৎপাত্র বেরিয়ে আসছে, তেমনটা নয়। সেখানে ইটের তৈরি পাঁচিল ধ্বংসাবশেষ বেরিয়ে আসছে, সেটা দেখেছি। তো এটা অবশ্যই একটা নগরকেন্দ্র বা নদীবন্দরের ভগ্নাবশেষ হতে পারে। তো উৎখননের এ-জন্যই প্রয়োজন, কেন-না উৎখনন হলে এই কালপর্বটাকে আমরা আরও ভালো করে যাচাই করে নিতে পারব। এবং তখন আমাদের, এই সভ্যতার সম্পর্কে আমাদের ব্যাখ্যাগুলো আরও যথোপযুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবে।


তন্ময়— যে-কোনো অঞ্চলের স্থানীয় ইতিহাস সংরক্ষণের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক সংগ্রহশালাগুলোর ভূমিকা অপরিসীম। আনুলিয়া, দেবলগড় প্রত্নসংগ্রহশালার শুরু কীভাবে? এবং তার যে প্রত্নবস্তুগুলো, যা যা ওখানে রয়েছে, সেগুলো উদ্ধারের নেপথ্য-কাহিনি কীরকম?

বিশ্বজিৎ রায়— এটা বলতে আমারও খুব ভালো লাগে। এটা ব্যক্তিগতভাবে আমার খুব প্রিয় একটা জায়গা।


তন্ময়— এবং আপনি ব্যক্তিগতভাবে জড়িতও এই পর্বটার সঙ্গে…

বিশ্বজিৎ রায়— হ্যাঁ। বিষয়টা হচ্ছে, আমার পিএইচডিটা শেষ হয়ে যায় ২০১৩-র মধ্যে। তো আমি তখন অনেকটা সময় পাই, এগুলো ঘুরে ঘুরে দেখার জন্য। এমন সময় গেছে ভাই, যখন আমি মে-জুন মাসের প্রচণ্ড যে রৌদ্র, সেই রোদে সকালবেলা ৯টা থেকে হেঁটে বেড়াচ্ছি, আর মোটামুটি বিকেল ৫টা যখন বাজে, আমি তখন ধুঁকতে ধুঁকতে একটা গাছতলায় বসে আছি হয়তো। আর এই গোটা সময়টায় আমাকে কেউ কিচ্ছু খেতে দেননি। এবং তুমি যদি দেবলগড়ে যাও, কেন্দ্রীয় অংশে যাও এটা বুঝতে পারবে, এটা আনুলিয়াতে অতটা বোঝা যাবে না। সেখানে ওই দেবলগড়ে তো বিস্তীর্ণ এলাকায় কোনো জনবসতি নেই। চাষের মাঠ আর চাষের মাঠ, জঙ্গল। তো সেখানে আমাকে কিন্তু কেউ আপ্যায়ন করেননি। এটা কিন্তু প্রথমদিকে ভারি কষ্টকর একটা অভিজ্ঞতা ছিল। সমস্তটাতেই। গোটা বৃহত্তর দেবলগড় প্রত্নক্ষেত্রেই। আমার কাঁধে একটা ঝোলা ব্যাগ থাকত, আর আমি মাটির ভাঙাচোরা হাঁড়ি-কলসির টুকরো সেগুলোকে ওই ঝোলায় ভরতাম। এইটা দেখে মানুষজন আমাকে দুটো জিনিস ভাবতেন। প্রথমত, এ একটা পাগল। আর দ্বিতীয়ত, এ ছেলেধরা-টেলেধরা হতেও পারে। ফলে, ওই বাচ্চাগুলোকে আড়াল করা, গাঁয়ের মেয়ে-বউরা দ্রুত তফাতে চলে যাওয়া, আর পুরুষ মানুষরা সন্দেহের চোখে দেখা— এটাই আমার জন্য বরাদ্দ ছিল। একটু একটু করে এটা বদলাতে থাকে বছর ঘোরার সঙ্গে-সঙ্গে। মাসের পর মাস, এক বছর, দুবছর ধরে যখন আমি যেতেই থাকি, গ্রামে মাঠে চাষ করছেন একজন চাষি, তার সঙ্গে দুটো কথা বলতে থাকি, তখন অবস্থাটা বদলাতে থাকে। এই অবস্থাটা বদলাতে থাকার কাজটা আমি সচেতনভাবে চেয়েছিলাম। কেন চেয়েছিলাম? চেয়েছিলাম এই কারণে, ভূ-প্রত্নচর্চা, প্রত্নতত্ত্বচর্চা— এই কথাগুলো ভারী ভারী শব্দ। সাধারণ মানুষের থেকে এই বিদ্যাচর্চার অবস্থান কয়েক যোজন দূরে। বা বলা যায়, যে পেশাদার গবেষক বা অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ইত্যাদি ইত্যাদির গজদন্ত মিনারে বসে থেকে সাধারণ মানুষের সাথে যোগাযোগটা বোধহয় ছিন্ন হয়ে যায় আমাদের। তাই জন্য দেশের সাধারণ মানুষ, খেটে খাওয়া মানুষ, মেহনতি মানুষ— তাঁরা না ইতিহাসচর্চায়, প্রত্নতত্ত্বচর্চায়, ভূমিরূপবিদ্যাচর্চায় স্বীকৃতি পান না, উৎসাহ পান না। নচেৎ আমি নিশ্চিত, সাধারণ মানুষের ব্যবহারিক জ্ঞান যে-কোনো পুথিবাবুর থেকে বহু-বহু গুণ সমৃদ্ধ। কিন্তু সাধারণ মানুষ, মেহনতি মানুষ এই বিদ্যাচর্চাগুলোতে আগ্রহ দেখান না, তার কারণ একটা বিদ্যাচর্চার ব্যবধান তৈরি হয়। আমরা এগুলোকে সাধারণ মানুষের বাইরেই বোধ হয় রাখতে বেশি পছন্দ করি। আমি চেয়েছিলাম এইটা কাটুক। কারণ, যতক্ষণ না সাধারণ মানুষ, তাঁদের স্থানীয় ইতিহাস, স্থানীয় দেশ, স্থানীয় সমাজ গড়ার ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠবেন, ততক্ষণ আমি ইতিহাসচর্চা, ইতিহাস সংরক্ষণ, সংগ্রহশালা স্থাপন এবং বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে পুরাক্ষেত্রকে রক্ষণাবেক্ষণ এবং তার ডকুমেন্টেশনের কাজ চালাতে পারব না। কেউ পারবেন না, যদি না সাধারণ মানুষ এগিয়ে আসেন।

ঈর্ষাক্ষাৎকার: সুপ্রিয় চৌধুরী — দ্বিতীয় পর্ব


তন্ময়— প্রথম থেকে কি আপনি আনুলিয়া-দেবলগড়ের রহস্যভেদ করার লক্ষ্য নিয়েই নেমেছিলেন?

বিশ্বজিৎ রায়— একদম, একদম। এগুলো আমাকে তীব্র কৌতূহল জাগিয়েছিল। এবং এই প্রশ্নগুলোর উত্তরও আমার পাওয়ার দরকার ছিল। আমি যেটা ইন-অ্যাডিশন ভেবেছিলাম, সেটা হচ্ছে, আমি না, প্রচেষ্টাটা হবে ‘আমরা’। ভগীরথ যেমন গঙ্গাকে নিয়ে এসে ছাইগুলোকে সরিয়ে প্রাণের সঞ্চার করেছিলেন, তেমন স্থানীয় মানুষেরা এগিয়ে এসে সমবেত উদ্যোগ নেবেন। আমাদের ইতিহাসের এই অচলাবস্থাটা কাটানোর জন্য, বা বিদ্যাচর্চার এই যে অচলায়তন— সেটাকে ভাঙার জন্য সাধারণ মানুষকেই উদ্যোগ নিতে হবে। হ্যাঁ, সেই উদ্যোগ নেওয়ার কাজে ওই সলতে পাকিয়ে দেওয়ার কাজটুকু, আমাদের মতো যাঁরা বাইরে থেকে আসছি তাঁদেরকে করে দিতে হবে। তাই জন্যে প্রথমদিকের বছরগুলোতে যখন কেউ পাত্তা দিতেন না, পাগল আর ছেলেধরা ভেবে পাশ কাটাতেন, আমি তখন দিনের পর দিন ওই মানুষগুলোর সঙ্গে পরিচয় গড়ে তোলার চেষ্টা করতাম। এবং করতে করতে করতে এমন একটা সময় এল যখন কেউ একজন বললেন— আমার আজও মনে আছে, একদিন আমি পেয়েছিলাম একটা কলা, দুটো বাতাসা আর একটা কাঁসার ঘটি ভর্তি জল। তারপর সেটা হয়ে দাঁড়ায় বিকেলবেলার চা-বিস্কুট। এবং তারপর সেটা হয়ে যায় দুপুরবেলার ভাত এবং ডাল। এই করতে করতে ২০১৫ সাল নাগাদ, আমি গ্রামের মানুষদের সঙ্গে কথা বলার জায়গাটায় এসে পৌঁছাই। এবং তারপর বিভিন্ন গ্রামের মানুষদের সঙ্গে মাঠে বসে, উঠোনে বসে, ব্যক্তিগত আলাপচারিতার মধ্যে দিয়ে তাঁদেরকে বোঝানো, একটা সংগঠন গড়ে তুলতে হবে। একটা চেহারা দিতে হবে এই উদ্যোগটার। তখনই আশেপাশের গ্রামের মানুষদের নিয়ে একটা সংগঠন গড়ে তোলা। এইভাবেই ওই সংগ্রহশালাটা গড়ে উঠেছে, যেখানে সবটাই কিন্তু করেছেন ওই সাধারণ মানুষরা। একজন তাঁর বাড়িটা ছেড়ে দিয়েছেন সংগ্রহশালা করার জন্য, একজন চারটে কাঠের আলমারির ব্যবস্থা করে দিয়েছেন, একজন আলোর ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। আমার খুব প্রিয় পাত্র, আমি অবশ্যই তাঁর কথা বলব, রঞ্জন তাঁর নাম, বাড়ি গাঙনাপুরের দেবগ্রাম গ্রাম পঞ্চায়েতে। রঞ্জন ভ্যান চালায়। রঞ্জন আমাদের সবচেয়ে প্রিয় সদস্য, রঞ্জন আমাদের এই গোটা উদ্যোগের একটা ঝকঝকে অভিজ্ঞান। রঞ্জন কী বলেছে জানো? রঞ্জন বলেছে, ‘দাদা আমি আর কিছু করতে পারব না, তবে তোমাদের লোকজন যেদিন আসবে, আমি সেদিন গাঙনাপুর স্টেশনে ভ্যান নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকব। আমি আমার ভ্যানে করে দুটো লোককে এনে দেব। ওইটুকু আমার কনট্রিবিউশন হবে। রঞ্জন ওইটুকুই করবে, ওইটুকুই তাঁর সামর্থ্য, কিন্তু তাও সে করবে নিঃস্বার্থভাবে। এইটাই তো পিপলস আর্কিওলজি। গণ-প্রত্নবিদ্যা। 

আমাদেরকে বহু বহু পথ হাঁটতে হবে। ব্যক্তিগতভাবে আমি কিছুজনকে চিনি, বিভিন্ন প্রত্নক্ষেত্র ঘুরে, দেখে, তাঁরা যা প্রত্নবস্তু, প্রত্ননিদর্শন পান— সেগুলোকে খাটের তলায় চালান করেন। এবং আমি খুব খেদের সঙ্গেই বলছি, খাটের তলা থেকে এই প্রত্নবস্তুগুলো কিন্তু খুব দ্রুত বাইরে পাচার হয়ে যায়। এবং বহু বহু নিদর্শন, আমাদের গোটা বাংলারই, হয়তো দেখা যাবে কোনো ধনী ব্যবসায়ীর ড্রইং রুমে আজকে শোভা পাচ্ছে। তার কারণটা হচ্ছে, এই প্রত্নবস্তুগুলোকে সংগ্রহ করে তাঁরা তাঁদের খাটের তলায় ঢুকিয়ে রেখেছেন। তাঁরা তাঁদের ব্যক্তিগত সংগ্রহে তালাবদ্ধ করে ফেলে রেখেছেন। কেউ জানতেও পারল না। আর কেউ জানল তো মোটা দামে কিনে নিয়ে ড্রইংরুমে রেখে দিল। এই জন্য দেখো, আমি কিন্তু আমার কোনো প্রত্নসংগ্রহ নিজের বাড়িতে রাখিনি, কারো বাড়িতেই রাখার প্রস্তাব দিইনি। এমন একটা বাড়িতে রাখা হয়েছে যেটা একটা সংগ্রহশালা। সেখানে যে-কেউ যে-কোনোদিন গেলেই দেখতে পাবেন। 

আমার দেশ-কাল-ভাবনাটাকে উপস্থিত রাখতে হবে, স্থানীয় মানুষদের সাহায্য নিয়ে। তাঁরাই হবেন আমাদের ভগীরথ। তো বছরের পর বছর করতে করতে আজকে এই জায়গাটায় এসে দাঁড়িয়েছে। একটা সংগঠন হয়েছে। দশটা গ্রামের মানুষ এই সংগঠনে এসে দাঁড়িয়েছেন। আজ অনেক মানুষ কিন্তু এটার গুরুত্ব বুঝতে পারছেন, ভালোবাসছেন একটু একটু করে। বহু বাচ্চা আছে, যাঁরা কাজ করতে গিয়ে, খেলতে গিয়ে একটা ভাঙা ঘট পেলে ফেলে দেয় না। উঠোনের একপাশে রেখে দেয়। কখনও আমরা যদি যাই, আমাদের এসে দিয়ে যায়, কখনও আবার নিজেই হেঁটে এসে মিউজিয়ামকে দিয়ে যায়। এইভাবে আজকে একটু একটু করে মিউজিয়ামটা ফুলেফেঁপে উঠেছে সাধারণ মানুষের সাহায্য নিয়ে। এইটুকুই চেয়েছিলাম।

(পড়ুন দ্বিতীয় পর্ব)

অলঙ্করণ - অমর্ত্য খামরুই
অনুলিখন - শুভজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়

Powered by Froala Editor

Latest News See More