ধানক্ষেতই আস্ত ক্যানভাস, ব্যতিক্রমী শিল্পচর্চা পুনের প্রকৌশলীর

আশি ফুট বাই একশো কুড়ি ফুটের দৈত্যাকার এক ক্যানভাস। সেখানে খয়েরি রঙের ওপরে সবুজ শেডের মধ্যে দিয়ে ফুটে উঠেছে গণেশের প্রতিকৃতি। কখনও আবার ঝলমল করছে মেরিলিন মনরোর ছবি। তবে একটু মনোযোগ গিয়ে দেখলেই বোঝা যাবে বিষয়টা। না, রং-তুলিতে এই ছবি আঁকা হয়নি। বরং, চাষের ক্ষেতই হয়ে উঠেছে শিল্পীর ক্যানভাস। আর তার উজ্জ্বল বর্ণ? তা আসলে ধানের চারা। পুনের এই অভূতপূর্ব শিল্পকর্মের ছবিই এখন রীতিমতো ভাইরাল সোশ্যাল মিডিয়ায়।

শ্রীকান্ত ইঙ্গালাইকার। পুনের অভিনব শিল্পকলার পিছনে রয়েছে এই ৬৭ বছরের প্রকৌশলীরই একনিষ্ঠ শ্রম। পেশায় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হলেও, কলেজ জীবনে তাঁর পড়াশোনার বিষয় ছিল জীববিদ্যা। সেইসঙ্গে শখের গ্রাফিক ডিজাইনারও শ্রীকান্ত। আর এই প্রতিটা ক্ষেত্রের মেলবন্ধনেই জন্ম নিয়েছে এমন আশ্চর্য কীর্তি।

শ্রীকান্ত জানাচ্ছেন, বিভিন্ন প্রজাতির ধানের চারার পরিমাণ মতো রোপণের মাধ্যমেই গড়ে তোলা এই ছবি। সেখানে ব্যবহৃত হয়েছে মূলত নাজার বাথ এবং ব্ল্যাক প্যাডি’র চারা। তাছাড়া রয়েছে আরও কিছু ধানের প্রজাতি। প্রতিটি প্রজাতির ধানের চারার মধ্যে রঙের তারতম্যই গোটা দৃশ্যটার ভোল পাল্টে দিয়েছে। 

তবে গোটা বিষয়টি যতটা দৃষ্টিনন্দন, তার চিত্রায়ন ঠিক ততটাই দুঃসাধ্য একটি কাজ। বিঘার পর বিঘা জুড়ে ধানজমিতে পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব করে চারা রোপণের মাধ্যমে এমন চিত্রকলা তৈরি তো মুখের কথা না। কিন্তু এতটা সুনিপুণভাবে চারা রোপণ সম্ভব কীভাবে? শ্রীকান্ত জানাচ্ছেন, প্রথমে মূল ডিজাইনটির ব্লুপ্রিন্ট বানিয়ে নেওয়া হয় কাগজে অথবা কম্পিউটারে। তারপর সরু তার দিয়ে গোটা ধানক্ষেতকে ভাগ করে নেওয়া হয় ছোটো ছোটো বর্গাকার অংশ। অনেকটা ফোনের ক্যামেরার পিক্সেলের মতোই। তারপর সেই অংশগুলিতে সংশ্লিষ্ট বিশেষ প্রজাতির ধান রোপণ করা হয়।

আরও পড়ুন
৪১ লক্ষ নতুন বিলিয়নিয়র, অতিমারীতেও বৈপরীত্যের ছবি বিশ্বজুড়ে

তবে এই বিরূপ শিল্পকলায় শ্রীকান্তই প্রথম শিল্পী নন। প্রায় তিন দশক আগে ১৯৯৩ সালে জাপানের ইনাকাদাতে নামের ছোট্ট একটি গ্রামে জন্ম নিয়েছিল এই ব্যতিক্রমী চিত্রকলা। ধানবপন থেকে শুরু করে ধান কাটা পর্যন্ত গোটা সময়টাই সেখানকার ক্ষেতগুলি সেজে থাকে এমন অদ্ভুত সুন্দর নকশায়। সাধারণ কৃষকরাই সেখানে কার্টুন, খ্যাতনামা ব্যক্তিত্ব কিংবা দেশের বিভিন্ন সৌধের ছবি ফুটিয়ে তোলেন ধান্যক্ষেত্রে। তানবো আর্ট নামে পরিচিত ইনাকাদাতের এই শিল্প এখন রীতিমতো ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে এই অঞ্চলের। তা দেখার জন্য প্রতিবছর ভিড় জমান লাখ দুয়েক পর্যটকও। 

আরও পড়ুন
প্রথম চলচ্চিত্রের আগেই বানিয়ে ফেলেছিলেন পঞ্চাশেরও বেশি ছবি!

জাপানের সীমানা পেরিয়ে এই ব্যক্তিক্রমী শিল্প গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে চলতি শতাব্দীর প্রথম দিকেই। বর্তমানে প্রায় ১০০টি দেশে চর্চা হয় এই শিল্পকলার। তার মধ্যে অন্যতম তাইওয়ান, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলি। তবে বিশ্বে অন্যতম ধান্য উৎপাদক দেশ হওয়া সত্ত্বেও এই শিল্প থেকে ব্রাত্য ছিল ভারত। ২০১৬ সালে পুনের ইঞ্জিনিয়ারের হাত ধরেই এই শিল্প ঢুকে পড়ে ভারতের কৃষিজগতের অন্দরমহলে। তবে অধিকাংশ মানুষই অবগত ছিলেন না বিষয়টির সম্পর্কে। তবে সামাজিক মাধ্যমে এই ছবির জনপ্রিয়তা ধীরে ধীরে এই শিল্পের প্রতি সাধারণ কৃষকদেরও আকর্ষণ বাড়াবে, সে ব্যাপারে যথেষ্ট আশাবাদী শ্রীকান্ত…

আরও পড়ুন
লিভারপুল সমুদ্রসৈকতে মৎস্যকন্যার কঙ্কাল! সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল ছবি

Powered by Froala Editor