স্থানান্তর

বইমেলা থেকে ফিরে || পর্ব— ৭

শুরু থেকেই ভেবে রাখা ছিল টেবিলের ভিতরে বসেই লিখব এই ধারাবাহিক। পাঠক হিসাবে নয়, একটি পত্রিকার মতো ধুলোবালি খেয়েও দু-হপ্তার এই যাত্রা আসলে কেমন সেই কৌতূহল মেটাবো ভেবেই এ লেখার শুরু। বইমেলা তার স্বমহিমায় চলমান রয়েছে মানুষের মনে, সেখানে এই স্মৃতিচারণের আদপে কোনোই মূল্য আমি দেখি না। যেটুকু যা লাভ তা নিজেকে খালি করা। হাজার চাপ সামলেও অসময়ে গিয়ে পৌঁছানো সেই প্যাভেলিয়ানে যা তিনটুকরো হয়ে গেছে শুনে পাঠকের চেয়ে বেশি কেঁদেছেন পত্রিকার লোকেরা।

যাঁরা খুব কাছ থেকে চেনেন না তাঁদের বলে রাখা ভালো আমি একটা উটকো ছেলে, বইকে ভালোবেসে পৌঁছে যাইনি এই মাঠে, বরং একপ্রজন্ম আগেই ঠিক হয়েছিল বাপের কড়া পড়া আঙুল ধরে শেষদিন রাত্তির নটার সময় ঘণ্টার আওয়াজ শুনে রেড রোড পেরিয়ে পার্কিং-এ ঢুকব গাড়ি খুঁজতে। এভাবেই হয়তো মাদকের অভ্যাস ধরে যায়। একদিন সে তোমার কাছে আসে আর বাকি জীবন তুমি ছুটে যাও তার কাছে... দিদির উদ্যোগে একটি দেওয়াল পত্রিকায় সহকারী ছিলাম আমি, পত্রিকার নাম ছিল ‘তরী’। এই পত্রিকায় কে না লিখেছেন... তরী বন্ধ হয়ে যাওয়ার অনেকদিন পর নতুনভাবে শুরু হল মাস্তুল, বন্ধুদের নিয়ে, আমরা এভাবে জলেই থেকে গেলাম। পৃথিবীর তিনভাগ জয়ের ইচ্ছায় তাই এগোতে থাকল অপ্রথাগত বেঁচে থাকা। 

কলেজে উঠেছি তখন, ঋষিকেশ পার্কের গায়ের লাল মেস আর কলেজ স্ট্রিট ছাড়া কোথাওই থাকার নেই আমাদের, মাঝেমধ্যে ঘুরতে যাওয়া কলেজের ক্লাসে।  বন্ধুদের হোস্টেল ফেরার পথে সঙ্গ দিতে পৌঁছে যাওয়া বৈঠকখানা, সেখানে প্রেমিকার ত্বকের মতো স্পর্শে চিনতে শেখা বল্লারপুর ম্যাপলিথো, ন্যাচারাল অথবা পোরাস কোনও নতুন কাগজ। ইদুরের গর্তের মতো খোপে ঢুকে এস্টিমেট নেওয়া পকেট বুকের। এসবই চলতে চলতে একদিন সামনে দেখতে পেলাম বইমেলার গেট। সেই দরজা ঠেলে ঢুকলাম আমরা। সিনেমার সেট এর মতো ক্ষণস্থায়ী এক শহর। যেন অভিনয় করছে একটি শহর হয়ে ওঠার। সেখানে মাইকে বাজছে হারিয়ে যাওয়া বৃদ্ধের নাম, ঠিকানা মনে নেই তাঁর, জামার রং, গায়ের রং দিয়ে বিবরণ জানানো হচ্ছে, যদি বৃদ্ধ ঠিকানা ভুলে থাকেন, তাহলে কি এটাও ভুলে যেতে পারেন না, এখানে একাই এসেছিলেন তিনি, ফিরেও যেতে হবে তাই...

আরও পড়ুন
ভাষা, ভাষান্তর

নানাভাবে মোট চারটি ঠিকানায় সরে যেতে দেখলাম আমরা এই মেলাকে, ময়দান, যুবভারতী, মিলনমেলা এবং সেন্ট্রালপার্ক। ক্রমশ যেন কলকাতার বুকের মাঝখান থেকে হেঁটে শহরের বাইরে চলে যাচ্ছে বইমেলা, শিকড়ের আরও কাছে, জিওট্রপিক চলনে। এভাবে হাঁটতে হাঁটতে একদিন শহরের বাইরে খুব দূরে কোথাও হারিয়ে যাবে মেলা, ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া বৃদ্ধের বাড়ির হয়তো ঠিক পাশের মাঠেই হবে। ঠিকানা মনে না করলেও বাদামওলা তাকে চিনে পৌঁছে দেবে বাড়ির দরজায়। একদিন বই নিয়ে ঢুকছি দেখলে ব্যাগ না চেক করে স্যালুট করবে তরুণ পুলিশ আমাকে, খাবারের গন্ধে আর খিদে পেয়ে যাবে না টেবিলে বসে। একদিন সুস্থ হয়ে যাব, বারবার পেচ্ছাপ করতে ছুটতে হবে না বাথরুমে। একদিন আমার সংসার হবে, বইমেলার শেষ ঘণ্টাটা তার সঙ্গে দাঁড়িয়ে শুনব যার কেবল বাড়িটা দূরে বলে ফিরে যেতে হচ্ছে প্রতিবার, সময়ের চেয়ে আগে। আমার কড়া-পড়া আঙুল ধরে আবার হয়তো শুরু হবে একই রূপকথা। বইমেলার শেষ ঘণ্টা, নিজেকে দেখতে পাচ্ছি, হাততালি দিতে দিতে প্রবল হাসছি আমি, জড়িয়ে ধরছি সবাইকে, বন্ধুরা ক্যামেরায় প্রস্তুত অথচ একফোঁটা জলও আসছে না আর চোখে...

আরও পড়ুন
উপসংহার

Powered by Froala Editor

আরও পড়ুন
বাক্সবদল