‘আমাকে কখনোই অসুস্থ বলবে না, আমি সুস্থ আছি’ – বলতেন নবনীতাদি : অংশুমান কর

আমরা যারা নবনীতাদির কাছাকাছি ছিলাম বা আসতে পেরেছিলাম লেখালিখির সূত্রে, ওঁর প্রয়াণে সত্যি সত্যিই একজন প্রকৃত অভিভাবককে হারালাম। আমার সঙ্গে নবনীতাদির যে দীর্ঘদিনের আলাপ বা পরিচয়, তা নয়। তার চেয়ে অনেক বেশিদিন ধরে আলাপ ছিল ওঁর সময়ের অন্য আরও কয়েকজন কবির সঙ্গেই। কিন্তু খুব অল্পদিনের আলাপেই নবনীতাদি খুব কাছের করে নিয়েছিলেন আমাকে। এবং আমি অবাক হয়ে লক্ষ করতাম, খুব সহজ ভাবে মিশতেন আমাদের সঙ্গে, বয়সে যারা ওর চেয়ে ছোট সকলের সঙ্গে – যেটা খুব বিরল একটা ঘটনা। ওঁর সময়ের অনেককে আমি দেখেছি একটু গুরুগম্ভীর থাকতে, একটু দূরত্ব রাখতে। নবনীতাদি কখনও আমাদের সঙ্গে দূরত্ব রেখে মেশেননি। 

আমার সঙ্গে ওঁর সম্পর্কটা ছিল খুব ভালোবাসা আর বকাঝকায় মেশানো। আমাকে বকা দিয়েছেন প্রচুর, অনেকবার। সেগুলো মূলত কৃত্তিবাস সংক্রান্ত নানা কাজের জন্য। একেবারে জীবনের শেষ নিঃশ্বাস নেওয়া পর্যন্ত নবনীতাদি ছিলেন প্রকৃত অর্থে একজন কৃত্তিবাসী। সেই কারণেই, কৃত্তিবাসের কাজ করতে গিয়ে কোথাও যদি ছোটোখাটো ভুল ত্রুটি হত আমাদের, উনি খুবই বকা দিতেন। আমাকে তো বেশ কয়েকবার বকেছেন। নিজে ফোন করে বকেছেন।

আরও পড়ুন
মৃত্যু যেন রসিকতা, নবনীতা হাসছেন, বলছেন – ‘কামেন ফাইট’…

মাঝে মনে পড়ছে একটা ঘটনার কথা, একটা ছোট্ট অনুষ্ঠান আয়োজন করার কথা কৃত্তিবাসের তরফ থেকে। ওদিকে নবনীতাদি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। অসুস্থতা নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথাও হয়েছে হোয়াটসঅ্যাপে। কিছুটা ইচ্ছে করেই ওঁকে আমি সেই অনুষ্ঠানটির কথা জানাইনি। কিন্তু অন্য একটি সূত্র থেকে তিনি অনুষ্ঠানটির কথা জেনে যান। উনি আমাকে ফোন করে বলেন যে , ‘তুমি কেন আমাকে অনুষ্ঠানের কথা জানাওনি? আমি তখন বলি, ‘নবনীতাদি, আপনি খুব  অসুস্থ, আমি চাইছিলাম না আপনাকে বিড়ম্বনায় ফেলতে।’ এতে উনি প্রচণ্ড রেগে যান এবং বলেন, ‘তুমি আমাকে কখনোই অসুস্থ বলবে না। আমি রীতিমতো সুস্থ আছি। তুমি জানাওনি, এটা তোমার ত্রুটি। আগে তুমি ত্রুটি স্বীকার করো।’ তারপর হাসিঠাট্টার মধ্যে দিয়ে সেদিনের বকাঝকার পর্ব শেষ হয়। এরকমই ছিলেন নবনীতাদি, এরকমই মানুষ।

লেখার ক্ষেত্রে কীই বা বলব! ওঁর মতো বাংলা সাহিত্যের সবকটি ধারায় এত স্বাভাবিক, স্বচ্ছন্দ বিচরণ খুব কম কবি-সাহিত্যিকই করতে পেরেছেন। ওঁর একটা সাংগঠনিক ক্ষমতা ছিল, যেটা ‘সই সভা’ নির্মাণ করে প্রমাণও করে দিয়েছেন অনেকখানি। সই-এর কাজকর্ম যেভাবে ছড়িয়েছে, ব্যাপ্ত হয়েছে, তার কেন্দ্রে ছিলেন নবনীতাদি। আমি লক্ষ করে দেখেছি যে, আমাদের সময়ে আমাদের মেয়ে বন্ধুরা যারা কবিতা লিখেছে, তাদের অনেকেই নবনীতাদিকে খুব আপন মনে করত। সই মনে করত। অত্যন্ত বিরল ঘটনা এই যে, সইয়ের মতো একটি সংগঠনকে তিনি সচল রাখতে পেরেছিলেন।

তুমি আমাকে কখনোই অসুস্থ বলবে না। আমি রীতিমতো সুস্থ আছি। তুমি জানাওনি, এটা তোমার ত্রুটি। আগে তুমি ত্রুটি স্বীকার করো।

বাংলা কবিতার জগতে ওঁর একটি বিশেষ স্থান থাকবে। সব লেখাই তো লিখেছেন উনি। ওঁর মতো ব্যক্তিগত গদ্য, স্মৃতিচারণ, রম্যরচনা কে-ই বা লিখতে পেরেছে। ছোটদের লেখাতেও তাঁর হাত ছিল চমৎকার, অপূর্ব। ছোটদের লেখা আমি এখনও বারবার ঘুরেফিরে পড়ি। পাঁচের দশকের কবিদের মধ্যে খুব বিশেষ একটি স্থান নবনীতাদি অধিকার করে থাকবেন। তেমনই একথাও বলতে হয় যে, অনুবাদ সাহিত্যের যে কাজ উনি করে গেছেন, তাও তুলনাহীন।

শেষের দিকে কৃত্তিবাসে নতুন কবিতা খুব একটা দিতে পারতেন না। বলতেন কবিতা লিখতে গেলে তো আসতে হয়, আমাকে জোর কোরো না। কিন্তু যখনই লেখা চেয়েছি, একেবারে টাটকা অনুবাদ আমাদের হাতে তুলে দিয়েছেন। একেবারে দিনক্ষণ মেনে। লেখা দেওয়ার ব্যাপারে ওঁর যে শৃঙ্খলা, সেটা থেকে কিন্তু আমাদের অনেকের শেখার আছে। এবং আমরা তো সকলেই দেখেছি, কী অসুস্থতার মধ্যেও প্রতিদিনের কলামে একটানা লিখে গেছেন। একটি কিস্তিও বাদ দেননি। আমি প্রতি রবিবার হাঁ করে তাকিয়ে থাকতাম নবনীতাদির লেখা পড়ার জন্য। কলামের লেখাগুলো নিয়েও একাধিক দিন ওঁর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। খুব মিস করব কলামগুলোকে। শেষের দিকে মনে হয়েছে, ওঁর সান্নিধ্যকে মিস করব।

যে-কোনো নতুন কাজে তিনি এতখানি উৎসাহ দিতেন, সুনীলদা ছাড়া সত্যি সত্যি ওঁর সময়ের বন্ধুদের কারও কাছ থেকে এত উৎসাহ পাইনি। খুব অসুস্থ অবস্থায় মুম্বাইতে আছেন, আমার লেখা পড়ে হোয়াটসঅ্যাপ করেছেন এই কিছুদিন আগে। এটাও একটা বড়ো পাওনা। ঐ যে বললাম, সকলকে একসঙ্গে নিয়ে থাকার যে অদ্ভুত ক্ষমতা দেখেছি সেটা খুব বিরল, যেটা ওঁদের জেনারেশনের এবং বিশেষ করে নবনীতাদির গুণ।

আমাদের বকাঝকা করার মানুষগুলো দিনে দিনে কমে যাচ্ছে

নতুন কবিদের জন্য তিনি ছিলেন দুয়ার সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে রাখা একজন কবি। কৃত্তিবাসে যখন সম্রাজ্ঞী আর অভিজিৎ নতুন সহ সম্পাদকের দায়িত্ব নিল, ওরা একটি অভিনব উদ্যোগ নিয়েছিল, ফেসবুকে লাইভ হবে কৃত্তিবাসের অনুষ্ঠান ও কবিতা পড়া। এবং সেই প্রথম অনুষ্ঠানে কবিতা পড়েছিলেন নবনীতাদি। যখন কৃত্তিবাসের নতুন ওয়েবসাইট হল, সেই ওয়েবসাইটেরও উদ্বোধন করেছিলেন তিনিই। সেখ সাদ্দাম হোসেন সেদিন নবনীতাদির বাড়িতে অনুষ্ঠানে কবিতাপাঠের সময় খুব ভয়ে ছিল, তাঁর সঙ্গে কবিতা পড়বে ভেবে। কবিতা পাঠ শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই সাদ্দামকে এত আপন করে নিয়েছিলেন নবনীতাদি যে, সাদ্দামের সমস্ত জড়তা কেটে যায়।

কিন্তু সবার শেষে, প্রথমে যে কথা বলে শুরু করেছিলাম সেই একই কথা বলব। সুনীলদা চলে যাওয়ার পর, দিব্যেন্দুদা চলে যাওয়ার পর, মাঝে মাঝে নবনীতাদির সঙ্গে কথা হত কৃত্তিবাসের কাজ নিয়ে। ছোটখাটো একটা দুটো পরামর্শ দিতেন, ভুল হলে বকা দিতেন। এটা ভেবে খুব মনখারাপ লাগছে যে, আমাদের বকাঝকা করার মানুষগুলো দিনে দিনে কমে যাচ্ছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here