২ অক্টোবর ও চন্দননগরের ‘স্বাধীনতা’

১৮৮৩ সালের ৫ মে। ফরাসি সাধারণতন্ত্রের অধিনায়কের কাছে গিয়ে পৌঁছল জনগণের আবেদনপত্র। তাতে অনেক কথার মধ্যে এটা লেখা ছিল, "যেমন স্তন্যপায়ী শিশুকে মাতা কখন ক্রোড় হতে ভূমিতলে নিক্ষেপ করিতে পারে না সেইরূপ আমরা আজি প্রায় দুই শত বছর হইল পুরুষানুক্রমে ফ্রান্সের (France) একান্ত অনুরাগী হইয়া তাহার ক্রোড়ে থাকিয়া তাঁহার সু-শাসন প্রণালীর সুখ-স্বচ্ছন্দতা ভোগ করিয়া আসিতেছি। এক্ষণে যে আমাদের সেই স্নেহময়ী জননী ফ্রান্স, বিনাপরাধে ২৬০০০ প্রজাকে, তাহাদের ভাবী মঙ্গলামঙ্গলের দিকে দৃষ্টিপাত না করিয়া, অকস্মাৎ তাঁহার ক্রোড় থেকে পরিত্যাগ করিয়া পরের হস্তে অর্পণ করিবেন ইহা মনে করিতে হইলে দুঃখ ও ভয়ে শরীর একেবারে অবসন্ন হইয়া পড়ে।"

শাসকদলকে এমনভাবে ভালোবাসার উদাহরণ খুব বেশি ইতিহাস লেখেনি। এই জনগণ চন্দননগরের (Chandannagar) বাসিন্দা। পরাধীন ভারতবর্ষে ইংরেজদের অত্যাচারের যে দগদগে ইতিহাস উঠে আসে, ফরাসিরা সেরকম অত্যাচার করেছে বলে জানা যায়নি। তাই হয়তো 'স্নেহময়ী জননী'। ফরাসি শাসনব্যবস্থা থেকে মানুষ আর যেতে চায়নি ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থায়। ১৭৮৯-এর ১৭ সেপ্টেম্বর 'কলকাতা গেজেট'-এ লেখা হয় "চন্দননগরের গভর্নর মঁতিঞি ঘোষনা করিতেছেন যে,তথাকার দাস ব্যবসা রহিত করা হইল।" ১৯১২ সালের প্রথমদিকে পন্ডিচেরি থেকে যখন গভর্নর বাহাদুর চন্দননগরে আসেন, তখন চন্দননগরবাসী এক অভিনন্দনপত্রে অন্যান্য কথার সঙ্গে লিখেছিলেন, “ফ্রান্সের প্রতি আমাদের আন্তরিক অনুরাগ ও চিরদিন ফরাসী প্রজা থাকিবার আমাদের ইচ্ছার পুনরাবৃত্তি করিতেছি। আমাদের প্রার্থনা, আমাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ফ্রান্স যেন আমাদের পরিত্যাগ না করে। আমরা ফরাসী প্রজা হইয়া দেহ ধারণ করিয়াছি এবং ফরাসী প্রজা থাকিয়া দেহ ত্যাগ করিতে ইচ্ছা”। দাসব্যবসা বন্ধের উদার মানসিকতা যেমন ব্রিটিশদের মধ্যে দেখা যায়নি, ফরাসি ভারতে জালিয়ানওয়ালাবাগের মতো কোনো ঘটনাও ঘটেনি। ফলে, ফরাসিদের প্রজা হয়েই মরতে চাইবার ইচ্ছা কোনো 'কলোনিয়াল হ্যাংওভার' থেকে উদ্ভূত কিনা, তা নিয়ে গবেষণার অবকাশ আছে।

১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট। ভারত ছেড়ে চলে যায় ব্রিটিশরা। সেই দিন চন্দননগরের ফরাসি সরকার ‘চন্দননগর শাসন পরিষদ’ নামে একটি পরিষদ গঠন করে চন্দননগরকে অর্থনৈতিক স্বাধিকার ও কিছুটা শাসনভার অর্পণ করে। হরিহর শেঠকে সভাপতি এবং দেবেন্দ্রনাথ দাস, সুধাংশুশেখর দত্ত, অরুণচন্দ্র দত্ত, এককড়ি দত্ত ও শৈলেন্দ্র কুমার মুখোপাধ্যায়কে সহ-সভাপতি পদে মনোনীত করে তারা। ওই দিন প্ৰশাসনিক ভবনে ভারতের জাতীয় পতাকাও প্রথম উত্তোলন করা হয়।

ওই বছর ২৭ নভেম্বর আবার চন্দননগরে আসেন ফরাসি ভারতের গভর্ণর মঁসিয়ে বারঁ (C.F. Baron) এবং চন্দননগরকে 'ভিল লিবর' (Ville libre) বা মুক্তনগরী বলে ঘোষণা করেন। এবার পঁচিশ জনকে নিয়ে অধিক ক্ষমতাসম্পন্ন পৌরসভা ও শাসন পরিষদ গঠন করা হয়। হরিহর শেঠকে সভাপতি ও আগের পাঁচজন ও তার সঙ্গে ডাঃ আশুতোষ দাসকে সহ সভাপতি পদে নির্বাচিত করা হয়। এই সভার প্রথম দিনের অধিবেশনে বেশ কয়েকটি জনমুখী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এখানকার সরকারি বেসরকারি সব বিদ্যালয়ের প্রাথমিক বিভাগের ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষা অবৈতনিক করা হয়। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলির ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষাও অবৈতনিক করে দেওয়া হয়। আর উচ্চ শ্রেণীগুলিতে শতকরা দশজনের শিক্ষা অবৈতনিক করা হয়। এখানকার মিউনিসিপ্যালিটির হেড ট্যাক্স ও সাইকেল ট্যাক্স বলে যে দুটি ট্যাক্স ছিল, তাও তুলে দেওয়া হয়।

আরও পড়ুন
বিশ্বযুদ্ধে প্রাণ দেওয়া প্রথম বাঙালি সৈনিক, বিস্মৃতির অতলে চন্দননগরের যোগেন্দ্রনাথ

১৯৪৮-এ ‘কলেজ দে বুশি' হয় 'চন্দননগর কলেজ'। ‘কলেজ দ্যুপ্লেক্স' হয় 'কানাইলাল বিদ্যামন্দির'। হাসপাতালের সামনের মাঠের নাম রাখা হয় ‘মহাত্মা গান্ধী পার্ক'। ৩৪টি পথের নতুন নামকরণ করা হয়। শাসন পরিষদের নতুন সভাপতি হন দেবেন্দ্রনাথ দাস। শাসন পরিষদ ‘চন্দননগর গেজেট' নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। পৌরসভার সদস্য শৈলেন্দ্রনাথ পাল পত্রিকা সম্পাদনা করেন। পরের বছরই সেই বিশেষ ঘটনাটি ঘটে যা ভারতের স্বাধীনোত্তর ঐতিহাসিক ঘটনাগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য। ১৯৪৯ এর ১৯ জুন চন্দননগরে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। এই গণভোটে জানার উদ্দেশ্য ছিল চন্দননগরবাসী ফরাসি ইউনিয়নের মধ্যে থাকতে চায় না কি ভারতীয় রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হতে চায়? যে চন্দননগরবাসী ফ্রান্সকে 'স্নেহময়ী জননী' বলেছিল একদিন, তারাই প্রায় ৯৯ শতাংশ বলে দিল যে ফ্রেঞ্চ ইউনিয়নে তারা আর থাকতে চায় না। এই গণভোটের ব্যবস্থা ফ্রান্সের গণতন্ত্রের কথা মনে করিয়ে দেয়। ‘চন্দননগর গেজেট' এই গণভোটের ফলাফল প্রকাশ করেছিল।

আরও পড়ুন
ভারতের প্রথম ‘লিজিয়ঁ দ্য অনার’ প্রাপক দুর্গাচরণ, তাঁর স্মরণেই দাঁড়িয়ে চন্দননগরের স্ট্র্যান্ড

পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু গণভোটের ফলাফল জানতে পেরে পৌরসভা ও পরিষদ সভাপতিকে একটা তার বার্তায় শুভেচ্ছা পাঠিয়েছিলেন।

১৯৫১ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ভারত সরকারের কাছে চন্দননগরের আইনত হস্তান্তর স্বীকার করা হয়। ভারত ও ফ্রান্সের মধ্যে একটা চুক্তিপত্র স্বাক্ষরিত হয়। ফ্রান্সে ভারতীয় রাষ্ট্রদূত সর্দার হরদিৎ সিং মালিক এবং ফরাসি পররাষ্ট্র দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত প্রধান আধিকারিক মঁসিয়ে দ্য ল্য তুরনেল নিজের নিজের সরকারের পক্ষে চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেন।

অবশেষে ১৯৫২ সালের ১১ এপ্রিল হস্তান্তর চুক্তিপত্র ফরাসি জাতীয় পরিষদের অনুমোদন পায়। ৩০ জুন ভারত সরকারের এক বিজ্ঞপ্তিতে ঘোষণা করা হয়, ভারতের রাষ্ট্রপতি ভারত সরকারের বৈদেশিক দপ্তরের অধীনে এ্যাডমিনিস্ট্রেটরের মাধ্যমে চন্দননগর শাসন পরিচালন করবেন। এর পরই পৌরসভা ও শাসন পরিষদ বাতিল হয়ে যায়। ১৯৫৪ সালের ২ অক্টোবর মহাত্মা গান্ধীর জন্মদিনে আনুষ্ঠানিকভাবে চন্দননগর পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্ভুক্ত হয়। তারপরেই মহকুমা শহর হিসেবে গণ্য করা হয়। ২ অক্টোবর যে শুধু মহাত্মা গান্ধীরই জন্মদিন না, তার সঙ্গে চন্দননগরও যে পশ্চিমবঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুপ্রবেশ করল—সে খবর রাখে কি ইতিহাস? সত্তর থেকে মাত্র এক কদম দূরে সে দাঁড়িয়ে।

Powered by Froala Editor