নির্জন দ্বীপে আজও লুকিয়ে সেই গুপ্তধন, যা দিয়ে কিনে ফেলা যায় গোটা পৃথিবী!

দক্ষিণ আমেরিকার আদিম উপজাতির মানুষদের ‘অসভ্য’। অন্তত এমনটাই মনে করতেন ইউরোপের ঔপনিবেশিক শাসকরা। কিন্তু কেন এমন ধারণা? কারণটা খুবই বস্তুতান্ত্রিক এবং স্পষ্ট। জীবনের প্রতিটা কাজেই যথেচ্ছভাবে সোনা ব্যবহার করে তারা। দেবদেবীর মূর্তি, পূজার সরঞ্জাম সোনার; একথা তাও মানা যায়। কিন্তু রান্নার বাসন, নৌকার হাল এসবেও সোনা? আবার এখানেই শেষ নয়। উপজাতির সর্দার স্নান করে সোনার গুঁড়ো মেখে। চোখে সুরমা লাগায়, সেও সোনার গুঁড়োয় তৈরি।

সারাদিন এত সোনা ফেলে ছড়িয়ে নষ্ট করে যারা, তাদের আর যাই হোক সভ্য বলতে রাজি নন ইউরোপীয়রা। এতো সোনা পেলে তো সারা পৃথিবীটাই কিনে ফেলা যায়। পেরুর স্প্যানিশ শাসক তাই নির্দেশ দিলেন, দেশের যেখানে যত সোনা আছে সব জড়ো করতে হবে লিমা শহরের গির্জায়। এখন থেকে সব রাষ্ট্রের সম্পত্তি। রাষ্ট্রের অর্থাৎ চার্চের। কারণ ধর্মনিরপেক্ষতার কথা তখনও ওঠেনি। সেই ১৮২০ সালেই এভাবে বিদেশি শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের বীজ অঙ্কুরিত হয়েছিল পেরুর আদিম উপজাতির মানুষদের মনে।

দেখতে দেখতে লিমার গির্জা ভরে উঠল সোনায়। অসংখ্য অলঙ্কার, মূর্তি এসব তো আছেই। সঙ্গে আসবাব, বাসনপত্র। ক্যাপ্টেন থম্পসন তখন দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার শেষে কিছুদিন বিশ্রামে নেবেন বলে স্থির করেছেন। সারাদিন ডুয়েল খেলে আর সন্ধ্যার পর থেকে সুরাপাত্রে নিমগ্ন হয়ে দিন কাটাচ্ছেন। এমন সময় ডাক এল রাজদরবার থেকে। বিশেষ গোপন একটি মিটিং-এ তাঁকে জিজ্ঞেস করা হল, তিনি এবং তাঁর জাহাজ মেরি ডিয়ার পরদিন ভোরবেলা আবার সমুদ্রযাত্রার জন্য প্রস্তুত কিনা। পাল্টা প্রশ্ন করার কোনো অবকাশ নেই। কোথায় যেতে হবে, কেন যেতে হবে এসব সম্পর্কে প্রশ্ন করার কোনো সুযোগ নেই। নিরুপায় হয়ে রাজি হলেন ক্যাপ্টেন থম্পসন। আর তারপরেই জন্ম নিল এক রূপকথা।

জাহাজে উঠে ক্যাপ্টেন জানতে পারলেন, উপজাতি বিদ্রোহের ভয়ে লিমা গির্জার সমস্ত সোনার জিনিস সরিয়ে ফেলা হচ্ছে। যাতে স্পেনের সৈন্যরা কোনো কারণে পরাজিত হলেও সোনার সন্ধান না পায় বর্বর আদিবাসীরা। শুনে অবাক হলেন ক্যাপ্টেন। লিমা গির্জার সমস্ত সোনা! মানে সমস্ত পৃথিবী কিনে নেওয়া যায় যা দিয়ে! আর তার দায়িত্বে তিনি নিজে! সরকারি কর্মচারী অবশ্য দুজন আছেন। তাঁদের দেহরক্ষীরাও আছে। কিন্তু এই অকূল সমুদ্রে তাদের মেরে ফেলতে আর কতটুকু সময় লাগবে? অন্তত সমুদ্রের বুকে তো তিনিই রাজা। সমস্ত কাজ হল পরিকল্পনা মাফিক। একে একে সবাইকে মেরে ফেললেন ক্যাপ্টেন থম্পসন। মাঝিমল্লাদেরও বাদ দিলেন না। এমন কাজের কোনো সাক্ষী রাখতে নেই, সেকথা তিনি জানেন। তারপর জাহাজ ঘুরিয়ে পৌঁছে গেলেন এক নির্জন দ্বীপে।

প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে ছোট্ট জঙ্গলঘেরা দ্বীপ কোকোস। মানুষ তো দূরের কথা, চারিদিকে দুর্ভেদ্য জঙ্গল আর খাড়া পাহাড় ছাড়া কিছুই নজরে পড়ে না। এই পাণ্ডববর্জিত দ্বীপে সমস্ত সোনা লুকিয়ে রাখলে আর কেউ তার সন্ধান পাবে না। তার সন্ধান জানবেন পৃথিবীতে কেবল একজন। ক্যাপ্টেন থম্পসন। ভাবতেই কেমন শিহরণ জাগল তাঁর শরীরে।

পাহাড়ের একটি গোপন গুহায় সমস্ত সোনা লুকিয়ে একটা ভেলা নিয়ে সমুদ্রের বুকে ভেসে পড়লেন ক্যাপ্টেন। তাঁর প্রিয় জাহাজ মেরি ডিয়ার-কেও সমুদ্রের জলে সমাধি দিয়েছেন আগেই। ঠিক করলেন, দেশে ফিরে বলবেন জাহাজডুবির পর কোনোক্রমে প্রাণ বাঁচিয়ে ফিরে এসেছেন তিনি। কিন্তু জাহাজের আর কোনো যাত্রীকেই বাঁচাতে পারেননি। বাঁচাতে পারেননি বিপুল সোনার সম্ভারকেও। কিন্তু ভাগ্য যেন নীরবে মুচকি হেসেছিল সেদিন। সমুদ্রের বুকে ক্যাপ্টেন পড়লেন জলদস্যুদের হাতে। তারপর কোনক্রমে প্রাণে বাঁচলেন যখন, তখন তাঁর শরীরে অসংখ্য ক্ষত। পাথরের আঘাতে থেঁতলে গিয়েছে একটা পা। সামুদ্রিক মাছের মাংস তুলে নিয়েছে শরীরের নানা জায়গা থেকে। প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে একদল তিমি শিকারি মাঝি তাঁকে উদ্ধার করলেন। প্রাণে বেঁচে গেলেও, তাঁর স্মৃতি তলিয়ে গেল অতলে। তাঁর সাজানো গল্প আর বলতে হল না, সকলেই আন্দাজ করলেন সেটা। কিন্তু সেদিন তাঁর স্মৃতির সঙ্গেই তলিয়ে গেল লিমা শহরের সমস্ত সোনা। তার সন্ধান আর জানেন না কেউ।

লিমা শহরের সেই গুপ্তধনের কাহিনি ক্রমশ এক কিংবদন্তিতে পরিণত হয়। প্রকৃতপক্ষে যে জাহাজডুবি হয়নি, সবই ক্যাপ্টেন থম্পসনের ষড়যন্ত্র; এমন সন্দেহ কার কী কারণে হয়েছিল সেটা বলা মুশকিল। শোনা যায় জলদস্যুদের কাছে নাকি তিনি সব স্বীকার করেছিলেন। আবার কেউ কেউ বলে, জলদস্যুদের হাত থেকে তাঁকে বাঁচিয়েছিল একটি ব্রিটিশ জাহাজ। সেই জাহাজের ক্যাপ্টেনকে তিনি পথ দেখিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন কোকোস দ্বীপে। সঠিক বলা যায় না কিছুই। তবে সেই গুপ্তধনের সন্ধানে আজও অনেকেই পাড়ি দেন গভীর জঙ্গলে ঘেরা সেই দ্বীপে।

কোকোস দ্বীপে গুপ্তধনের কাহিনি অবশ্য আরও আছে। অনেকে বলেন, ১৮১৮ সালে একটি ব্রিটিশ জাহাজের ক্যাপ্টেন বেনেট বহু মূল্যবান অলঙ্কার লুকিয়ে রেখে এসেছিলেন সেই দ্বীপে। অনেকে বলেন সেই দ্বীপে সোনার অলঙ্কার লুকিয়ে রেখেছেন স্পেনের জলদস্যু বেনিটো। সমস্ত কাহিনিই ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে তৈরি। তবে সত্যতা জানা যায় না কিছুই।

তবে কোকোস দ্বীপের গুপ্তধন কেবল গল্প নয়। অন্তত আজ একথা হলফ করেই বলতে হয়, কোথাও একটা সত্যতা আছে। কারণ বছর চারেক আগে, ২০১৬ সালে এই দ্বীপে একটি গুহা থেকে উদ্ধার করা হয় অজস্র সোনার অলঙ্কার। বর্তমান বাজারে তার দাম প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলার। লিমার গুপ্তধনের পরিমাণ যদিও আরও অনেক বেশি হওয়াই স্বাভাবিক। কী জানি, হয়তো একদিন কোনো গুহা থেকে সত্যিই উদ্ধার হবে সেই ধনরাশি। যা দিয়ে গোটা পৃথিবী কিনে ফেলা যায়। অথব সত্যিই চিরকালের মতো সমুদ্রের গর্ভে তলিয়ে গিয়েছে সমস্ত কিছু।

More From Author See More

Latest News See More